যাদবপুর
লোকসভার অন্তর্গত নরেন্দ্রপুরে পাঁচ বছরের আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ করে খুন, প্রমাণ লোপাট করতে মৃতদেহ
পোঁতা হল বাগানে।
যাদবপুর
লোকসভার অন্তর্ভুক্ত কেয়াদহ ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের বামনঘাটা এলাকায় এক ৫ বছরের
আদিবাসী মুন্ডা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগ উঠল পড়শি এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
প্রমাণ লোপাট করতে ছোট্ট একরত্তি মেয়েটির মৃতদেহ পাশের বাগানে পুঁতে দেয় অভিযুক্ত
আজগর আলি। অভিযুক্ত আজগর আলি কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গত ১৫ জুলাই,
২০১৯ থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটির। ২০ জুলাই খোঁজ মিলল, তবে
মৃতদেহের। বাড়ির কাছেই একটি বাগানের মধ্যে পোঁতা ছিল দেহটি। মাটি খুঁড়তেই পচা
গন্ধে সকলের হাত নাকে উঠে আসে। গর্ত থেকে পচা-গলা দেহটি বের করে আনে পুলিশ। পাঠানো
হয় ময়না-তদন্তে। ধৃত আজগারকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে।
নরেন্দ্রপুরের
উত্তর খেয়াদহে আজগার মোল্লার বাড়ির পাশেই থাকত মেয়েটি। আদিবাসী পরিবারটিতে নিয়মিত
যাতায়াত ছিল আজগারের। আজগার পেশায় ট্রাক চালক। ট্রাক নিয়ে বেরনো না থাকলেই পড়শির
বাড়িতে আড্ডা মারতে আসত সে। পড়শির পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে এ দিক ও দিক ঘুরতেও
যেত।
১৫ জুলাই
সন্ধে থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পাঁচ বছরের মেয়েটির। আঁধার নেমে এলেও মেয়ে না
ফেরায় চিন্তায় পড়ে যান বাবা-মা। পরের দিন সকালেও মেয়ে ফেরেনি। পুলিশি
নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে দুপুরে সোনারপুর-বামনঘাটা রোড অবরোধ করেন গ্রামবাসীরা।
পুলিশ এলেও উত্তজেনা কমেনি। ইতিমধ্যে পড়শিদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে আজগারের উপর।
প্রায়শই বাচ্চাটিকে নিয়ে তাকে ঘুরতে দেখেছে সকলে। আগের দিনও সন্ধের মুখে আজগারের
সঙ্গেই মেয়েটিকে শেষ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আজগারের বাড়ি তালাবন্ধ। এক সময় গ্রামের
মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। সকলে মিলে আজগারের বাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশের সামনেই
আজগারের টালির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। ঘর থেকে সব কিছু বের করে আগুন
ধরিয়ে দেওয়া হয়।
বাচ্চার
সন্ধানে এরপর চিরুনি তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। খেয়াদহের পরিত্যক্ত এলাকা, বনবাদাড়
বাদ যায়নি কিছুই। নামানো হয় স্নিফার ডগ। বাদ ছিল না ড্রোনও। তাতেও পাঁচ বছরের
মেয়েটির কোনও খোঁজ মেলেনি। একই সঙ্গে আজগারেরও খোঁজ চালাচ্ছিল পুলিশ। অবশেষে
শনিবার বারুইপুর জেলা পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ ও নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ
সোনারপুর স্টেশন চত্বর থেকে আজগারের খোঁজ পায়। লাগাতার জেরায় ভেঙে পড়ে আজগার।
খুনের কথা স্বীকার করে নেয়। সেই সঙ্গে জানায়, খুনের আগে
মেয়েটিকে ধর্ষণও করেছিল সে।
পুলিশ জেরায়
জানা যায়,
ঘটনার দিন বেশ ভালো মতো মদ খেয়ে আজগর আলি পাশের বাড়িতে গিয়েছিল।
বাচ্চাটি তাকে দেখে পেয়ারা খাওয়ায় বায়না ধরে। মেয়েটিকে পেয়ারা দেবে বলে দ্রুত কোলে
তুলে পাশের বাগানে চলে আসে। সেখানেই আজগারের উন্মত্ত লালসার শিকার হয় মেয়েটি।
যন্ত্রণায় ডুকরে কেঁদে ওঠে দুধের শিশুটি। তার কান্নার আওয়াজ চাপতেই মুখ চেপে ধরে
আজগার। তাতেই দমবন্ধ হয়ে মারা যায় বাচ্চাটি। উপায় না দেখে বাগানেই বাচ্চাটিকে
পুঁতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় আজগার। কয়েক দিন শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার বিভিন্ন
স্টেশনে ঘোরাঘুরির পর অবশেষে শনিবার রাতে ধরা পড়ে যায়।
সংবাদপত্রের
মাধ্যমে এই ঘটনার কথা জানতে পেরে সন্তান হারানো পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যান যাদবপুর
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন “সিধু কানহু বীরসা স্টুডেন্টস ফ্রন্ট” এর নেতা
কর্মীরা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে পরিচয় দিয়ে কেয়াদহতে জিজ্ঞাসাবাদ
করতে এক ব্যাক্তি রাস্তার ওপর থেকেই মেয়েটির বাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। তবে এই
নৃশংস ঘটনা নিয়ে সেই ব্যক্তিটির মধ্যে সেরকম কোন ক্ষোভ বা খারাপ কোন অনুভূতি ছাত্র
সংগঠনের সদস্যরা লক্ষ্য করেননি। বেশ কিছুটা হাঁটার পর মেয়েটির বাড়ি। রাস্তার পাশে
একটা এ্যাসবেসটাস দেওয়া দু কামরার বাড়ি। বাড়িতে তালা আটকানো। পাশের এক ভদ্রলোককে
জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন যে ওরা এখানে সেদিনের পর থেকে আর থাকে না। তারা
কুমোরপুকুরের দিকে একটি গ্রামে থাকছে। ঠিকানা জেনে ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা সেখানে
পৌঁছলেন। গ্রামে ঢুকেই কিছু না বুঝতে পারায় এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন। সেই ব্যক্তি
পারমিশানের কথা জিজ্ঞেস করেন। ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা
বলতে উনি নিয়ে গেলেন। তার কাছ থেকে জানা যায়, এই গ্রামে সবাই মুন্ডা
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস করেন।
মেয়েটির বাড়ি
গিয়ে দেখা গেল তিন জন ভদ্রমহিলা আর এক বাচ্চা আছেন। মেয়টির বাবা বা দাদা কেউই
ছিলেন না। ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের দেখেই দুই মহিলা জোরে বলে ওঠেন যে “আমারা কিছু
বলতে পারবো না,
মানা আছে। পার্টিই সব দেখবে বলেছে।” এই বলেই তাদের মধ্যে যিনি বয়স্ক
মহিলা ছিলেন তিনি মুখ ঘুরিয়ে কান্না শুরু করে দেন।ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের আাদিবাসী
হওয়ার পরিচয় দিয়ে, কথাবার্তা শুরু করতে গেলেও তিনি কিছুই
বলতে রাজি হন নি।
ওখান থেকে
ফেরার পথে ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা ভাবতে থাকেন যে ওই সর্বহারা আদিবাসী মেয়েটির
পরিবার সুবিচার পাবে তো?
নাকি দিনের পর দিন তাদের সাথে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে কুশমন্ডির
আদিবাসী মেয়েটির মত। কেননা অনেক মানবাধিকার সচেতন সংগঠন এখনো ঘটনাটি নিয়ে তেমন সরব
হয়নি। সত্যিই এই সরকার বিচার করবে তো? মেয়েটির পরিবার যেভাবে
সন্ত্রস্ত, ভীত তারা কি সত্যিই বিচারের দাবিতে গলা উঁচু করতে
পারবে? নাকি অভাবের সংসারে গরীব আদিবাসীদের নিরীহ মেয়েরা
এভাবেই একে একে শেষ হয়ে যাবে ?
সংবাদ সৌজন্য
– এই সময়, ২২/০৭/২০১৯ ও সিধু কানহু বীরসা স্টুডেন্টস ফ্রন্ট। ছবি - প্রতীকী
No comments:
Post a Comment