Friday, October 19, 2018

আদিবাসী মহিলাদের গাড়ি চালনো শিখিয়ে স্বনির্ভর করতে উদ্যোগী পশ্চিমবাংলা সরকার।


সেলাই, বাঁশ-বেতের কাজ বা আচার তৈরির প্রশিক্ষণের পর এবার আদিবাসী মহিলাদের গাড়ি চালানো শিখিয়ে স্বনির্ভর করতে উদ্যোগী হল ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসন। ঝাড়খণ্ড সীমানাবর্তী ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ি ব্লকের মহিলাদের স্বনির্ভর করতে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দিতে উদ্যোগী হয়েছে ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসন। ঠিক হয়েছে, বাছাই করা কিছু স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাকে ছোট গাড়ি ও অ্যাম্বুল্যান্স চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তার পর তাঁদের দেওয়া হবে গতিধারা প্রকল্পের গাড়ি। জঙ্গলমহলের এই জেলার শহরাঞ্চলে এক-দুজন মহিলা টোটো চালক দেখা গেলেও অ্যাম্বুল্যান্স কিংবা ভাড়ার গাড়ি মহিলারা চালাচ্ছেন, এমন দৃশ্য প্রায় বিরল। সেখানে বেলপাহাড়ির মতো প্রান্তিক এলাকায় মেয়েদের স্বনির্ভরতায় এমন ভিন্নধর্মী উদ্যোগ ঘিরে তাই জল্পনা শুরু হয়েছে
বেলপাহাড়ি মাওবাদীদের পুরনো ঘাঁটি। একটা সময় এই ব্লকের বিভিন্ন গ্রাম থেকেই একের পর এক মাওবাদী নেত্রী উঠে এসেছেন। বগডুবার জাগরী বাস্কে, বিদরি গ্রামের সুলেখা মাহাতোরা অত্মসমর্পণ করে মূলস্রোতে ফিরেছেন। মাজুগোড়া গ্রামের যমুনা মাহাতো কয়েক বছর আগে ওড়িশায় নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। আর বহু হামলা-নাশকতার নেতৃত্বে থাকা মাওবাদী নেত্রী জামিরডিহা গ্রামের জবা মাহাতো এখনও ফেরার।
বেলপাহাড়ির ঝাড়খণ্ড সীমানাবর্তী গ্রামগুলিতে নতুন করে মাওবাদী সক্রিয়তা শুরু হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবর। স্থানীয় যুবক-যুবতীদের মগজধোলাইয়ের চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা। তা ছাড়া, বেলপাহাড়িতে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভাল ফল করেছে আদিবাসী সমন্বয় মঞ্চ। এমন আবহে মহিলাদের গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আয়েষা রানি মানছেন, “এলাকাবাসীকে ঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি। তাছাড়া, মেয়েরা তো শক্তির আধার। সব কাজই তাঁরা পারেন। বেলপাহাড়ির মহিলারাও যখন গাড়ি চালাতে শুরু করবেন, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হবেন, তখন আর অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।জেলাশাসকের বক্তব্য  প্রশাসনের উদ্দেশ্য, বাইরে থেকে যাতে কেউ ভুল বোঝাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা।এই প্রকল্প রূপায়িত হলে বেলপাহাড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থার হাল ফিরবে বলেও আশা প্রশাসনের
যাঁদের জন্য এই উদ্যোগ, সেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীরা মহিলারা প্রকল্প নিয়ে কিছুটা দ্বিধায়। আমলাশোলের এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য রেণুকা সিংহ বলেন, ‘‘সাইকেল চালাতে জানি। গাড়ি চালাতে পারব কিনা, না-শিখলে বলতে পারব না।’’ শিমুলপালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য শ্রীমতী শবরের কথায়, ‘‘দলের বেশির ভাগ সদস্য বিবাহিত। সংসার সামলে গাড়ি চালানোর সময় বের করা সকলের পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে কেউ কেউ ডাকাবুকো আছেন। তাঁরা গাড়ি চালাতে পারবেন।’’
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, কিংশুক গুপ্ত, ১৪ অক্টোবর, ২০১৮

Tuesday, October 9, 2018

চোর সন্দেহে আদিবাসী ছাত্রকে মারধর, প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ স্থানীয় আদিবাসীদের।


দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটে পঞ্চম শ্রেণীর এক আদিবাসী ছাত্রকে চোর অপবাদ দিয়ে মারধর করার অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়াল। বালুরঘাটে এলাকার খাদিমপুর হাইস্কুলের হস্টেলের আবাসিক ওই ছাত্রকে মারধোর করার অভিযোগ উঠেছে এলাকারই একটি ক্লাবের যুবকদের বিরুদ্ধে।
ঘটনার প্রতিবাদে তির-ধনুক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পথ অবরোধ করেন স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রায় শপাঁচেক মানুষ৷ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন খাদিমপুর হাইস্কুল এলাকার একটি ক্লাবের কিছু যুবক ও কিশোর হস্টেল লাগোয়া স্কুল মাঠে খেলাধূলা করেন। অভিযোগ গত শুক্রবার খেলা চলাকালীন স্থানীয় এক যুবকের মোবাইল খোওয়া যায়। মোবাইলটি চুরির ব্যাপারে তারা হস্টেলের আবাসিক পঞ্চম শ্রেণীর আদিবাসী ছাত্রটিকে সন্দেহ করেন। আদিবাসী ঐ শিশুটিকে স্কুলের ছাদে টেনে নিয়ে মারধর ও ওপর থেকে ফেলে দিয়ে খুনের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। 
এই ঘটনায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে। মঙ্গলবার বেলা এগারোটা থেকে খাদিমপুর গার্লস স্কুল মোড়ের কাছে বিকেল পর্যন্ত বালুরঘাট-শিবরামপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন। অবশেষে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে বিকেল চারটে নাগাদ তাঁরা অবরোধ তুলে নেন।
সৌজন্য – কলকাতা ২৪ x৭, পর্ণা সেনগুপ্ত, ৯ ই অক্টোবর, ২০১৮।

Monday, October 8, 2018

ডাইনি-প্রথা লোপে রাষ্ট্রেরই দায় মনে করালেন কলকাতা হাইকোর্ট।


ডাইনি সন্দেহে তিন আদিবাসী মহিলাকে হত্যার দায়ে ৭ অভিযুক্তের ফাঁসির আদেশ রদ করে ডাইনি-প্রথা লোপে রাষ্ট্রেরই দায় মনে করালেন কলকাতা হাইকোর্ট।

ডাইনি তকমা দেগে তিন আদিবাসী মহিলাকে খুনের ঘটনায় নিম্ন আদালত ৭ জন অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছিল। আরও ৬ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছিল মেদিনীপুর আদালত। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট সাজাপ্রাপ্তদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জনেরই ফাঁসি রদ করে যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করল। আর আগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজনকে খালাস করে বাকিদের আগের সাজাই বহাল রাখল। কলকাতা হাইকোর্ট মনে করছে, যেখানে এমন ঘটনা ঘটে সেখানে বিচার বিভাগের থেকেও রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক বড়। ঘটনা থেকে স্পষ্ট, শিক্ষার আলো সব আঁধার ঘোচাতে পারেনি।
ডাইনি প্রথার মতো কুসংস্কার বন্ধে বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের পিছিয়ে পড়া জেলাগুলি থেকে অশিক্ষা দূর করতে জোরদার পদক্ষেপের জন্য রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। পশ্চিম মেদিনীপুরের দুবরাজপুর ও হরিদাসপুর গ্রামে মুন্ডা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২০১২ সালের ঘটনায় ৪৮২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল পুলিশ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি মৌসুমি ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ ডাইনি প্রথা রদে ২০১৬ সালে আদালতের নির্ধারিত গাইড লাইন মেনে শিক্ষা বিস্তার-সহ পিছিয়ে পড়া এলাকার উন্নয়নে জোর দিয়েছে। এমন এলাকায় নিবিড় নজরদারি এবং ঘটনার শিকার মহিলা বা পুরুষদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে হাইকোর্ট।
গ্রামের ঘরে ঘরে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় তোবা সিং নামে এক যুবকের নেতৃত্বে কয়েকশো গ্রামবাসী তিন মহিলাকে ডাইনি চিহ্নিত করে। তোবা সিং এখনও ফেরার। গ্রামের মোড়লরা তিন মহিলাকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করে। কিন্তু ওই মহিলারা এতই গরিব যে তা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। ৩ জনকে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়। এই ঘটনা সমাজের পিছিয়ে পড়ার নজির বলে মনে করে কলকাতা হাইকোর্ট।
সৌজন্য – এই সময়, ০৯ ই অক্টোবর, ২০১৮।

Thursday, October 4, 2018

ইসিএল (ECL) কতৃপক্ষকে জমি দিয়েও চাকরি না মেলায় অনশনে বসলেন আদিবাসী মঙ্গলা মান্ডি।


কয়লা খনি নির্মাণের জন্য ১২ বছর আগে ইসিএল (ECL) কতৃপক্ষকে জমি দিয়েও চাকরি না মেলায় ছেলেকে নিয়ে আমরণ অনশনে বসলেন আদিবাসী মঙ্গলা মান্ডি।  

পুরুলিয়া জেলার নিতুড়িয়ার সড়বড়ি মৌজায় দুবেশ্বরী গ্রামের প্রান্তে খোলমুখ খনি তৈরির জন্য বারো বছর আগে ইসিএল (Eastern Coal Fields - ECL) কতৃপক্ষ কে জমি দিয়েছিলেন আদিবাসী বিধবা মহিলা মঙ্গলা মান্ডি। ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে একটি চাকরি দাবী করেছিলেন। সেই সময় নাকি ইসিএল খনি কতৃপক্ষ চাকরি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারো বছর পরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ, মেলেনি চাকরি। অনেক বার ইসিএল কর্তৃপক্ষের দরজায় ঘুরেও কাজ হয়নি বলে অভিযোগ মঙ্গলা মান্ডির। তাই চাকরির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৮ থেকে নিতুড়িয়ার পারবেলিয়া কয়লা খনির অফিসের সামনে ছেলে বিদ্যাসর মান্ডিকে নিয়ে অনশন শুরু করেছেন তিনি। তবে ইসিএল কর্তৃপক্ষের দাবি, মঙ্গলা তাঁর জমির কিছু নথিপত্র জমা করতে না পারায় জটিলতা হয়েছে।
ইসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, বারো বছর আগে নিতুড়িয়ার সড়বড়ি মৌজায় দুবেশ্বরী গ্রামের প্রান্তে খোলমুখ খনি তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়েই এলাকার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে জমি গিয়েছিল দুবেশ্বরী গ্রামের বাসিন্দা বিধবা মঙ্গলা মান্ডির। অন্য লোকজন জমির ক্ষতিপূরণ হিসাবে টাকা নিলেও মঙ্গলা চাকরি দাবি করেছিলেন। জটিলতার শুরু সেই সময় থেকেই।
মঙ্গলার দাবি, বারো বছর আগে খোলামুখ খনির জন্য তাঁর ২ একর ৩৫ ডেসিমিল জমি গিয়েছিল। তাঁর বাবার বাড়ি দুবেশ্বরী গ্রামে। পারবেলিয়া কয়লাখনির অফিসের সামনে বসে মঙ্গলা মান্ডি বলেন, ‘‘খোলামুখ খনির জন্য ইসিএল যে জমি নিয়েছিল তার সবটাই ছিল আমার নামে। আমি সেই সময়ে চাকরির শর্তে জমি দিতে রাজি হয়েছিলাম। ইসিএলের আধিকারিকেরা চাকরি দেবেন বলে প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জমি নেওয়ার পরে চাকরির ব্যাপারে টালবাহানা শুরু হয়।”
কয়লা তুলে নেওয়ার পরে ওই খোলমুখ খনি এখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। বালি, ছাই দিয়ে খনি ভরাট করে দেওয়া হয়েছে। জমিতে চাষও হয় না। এই অবস্থায় কোনও মতে ছেলেকে নিয়ে দিন গুজরান করেছেন বলে দাবি মঙ্গলার। মঙ্গলা মান্ডির বছর বাইশের ছেলে বিদ্যাসর মান্ডি বলেন, ‘‘কয়লা খনির জন্য দেওয়া জমিটুকুই আমাদের সম্বল ছিল। বারো বছর আগে সেই জমি যাওয়ার পরে মাকে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন আমি দিনমজুরি করি।”
ইসিএল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি পেতে হলে নিদেন পক্ষে দুএকর জমি দিতে হয়। ইসিএলের সোদপুর এরিয়ার জেনারেল ম্যানেজার এমকে যোশী জানান, দুবেশ্বরীতে খোলামুখ খনি তৈরির সময়ে প্রথমে মঙ্গলা মান্ডির থেকে ১ একর ৭০ ডেসিমিল জমি নেওয়া হয়েছিল। তার বদলে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয় বলে আরও ৩০ ডেসিমিল জমি নেওয়া হয়। কিন্তু মোট দুএকর জমির মালিকানা সংক্রান্ত কয়েকটি নথি ওই মহিলার কাছে না থাকায় চাকরি দিতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সমস্যা নিয়ে অনেক বার ইসিএল কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়ে লাভ না হওয়াতেই অনশন শুরু করেছেন বলে দাবি করেছেন মঙ্গলা মান্ডি। তবে ইসিএল কর্তৃপক্ষের জিএম বলছেন, ‘‘আমরা জমি সংক্রান্ত সমস্ত নথি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেখান থেকে আরও কিছু নথি চাওয়া হয়েছে। সেই নথি আমরা তাঁকে জমা করতে বলেছি।”
দেখা যাক কবে নাগাদ মঙ্গলা মান্ডি বা তার ছেলে ইসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে চাকরি বা ক্ষতিপূরণ পান।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ০৫ ই অক্টোবর, ২০১৮।

নিরক্ষর আদিবাসী সৌরবি টুডুর দানের জমিতে গড়ে উঠছে শিশুশিক্ষা কেন্দ্র।

স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি সৌরবি টুডুর, অক্ষরজ্ঞান নেই তাঁর। কিন্তু আদিবাসী মহিলা সেই সৌরবি টুডুই এবার শিশুদের শিক্ষার আঙিনায় আসার সুযোগ করে দিলেন। তাঁর দান করা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। যার আনুষ্ঠানিক সূচনাও সৌরবি টুডু নামে ওই আদিবাসী মহিলার হাত দিয়েই করালেন প্রশাসনের কর্তারা। আর সৌরবির দেখানো পথে হাঁটলেন এলাকার আর এক বাসিন্দা বাসুদেব গুহ। তিনিও অঙ্গীকার করলেন আরও একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র গড়তে জমি দান করবেন বলেন।
শিক্ষার আলো ফোটাতে আদিবাসী রমণীর এমনই এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী রইল পূর্ব বর্ধমানের রায়না-২ ব্লকের উচালন গ্রামের বড় চৌকপাড় আদিবাসী পাড়া। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় জেলার ১৫৭ তম শিশুশিক্ষা কেন্দ্রের। অনুষ্ঠানে ছিলেন জেলা সর্বশিক্ষা মিশনের প্রকল্প আধিকারিক মৌলি সান্যাল, বিডিও দীপ্যময় মজুমদার, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পার্বতী ধাড়া ও সহকারী সভাপতি আনসার আলি খান। বিডিও জানান, এই শিশু শিক্ষাকেন্দ্র গড়ার জন্য সৌরবিদেবী তাঁর সম্বল দুই কাঠা জমি দান করেন। বিডিও বলেন, “দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ওই মহিলা।একজন আদিবাসী মহিলা যিনি স্কুলের গণ্ডিতে পা রাখেননি তিনি শিশুদের শিক্ষার আঙিনায় টেনে আনতে যে কাজ করেছেন তার প্রশংসা করেছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
সৌরবি জানান, খুবই দরিদ্র পরিবার ছিল তাঁদের। ইচ্ছা থাকলেও তিনি স্কুলে যেতে পারেননি। নিজে পড়াশোনা করার সুযোগ না পেলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই সুযোগ করে দিতেই এলাকার শিশুশিক্ষা কেন্দ্র গড়তে নিজের জমি দান করেছেন তিনি। পঞ্চায়েতের তরফে এলাকায় শিশুশিক্ষা কেন্দ্র গড়ার জন্য জমির খোঁজ শুরু হতেই নিজে এগিয়ে যান জমি দান করতে। নিজের শেষ সম্বল বলতে ছিল ওই দুই কাঠা জমি। তা দিতে কার্পণ্য করেনি তিনি। সরকারি অর্থে শিশুশিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠার পর খুব খুশি হয়েছেন সৌরবি। তাঁর দান করা জমিতেই এবার আদিবাসী শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো ফুটবে। উচালন গ্রামে আরও একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র গড়া হবে জানতে পেরে সৌরবির পথেই হাঁটলেন গ্রামের বাসুদেব গুহ। তিনি ওই শিশুশিক্ষা কেন্দ্র গড়ার জন্য তাঁর প্রয়াত বাবা কৃষ্ণমোহন গুহর নামে দেড় কাঠা জমি দান করার অঙ্গীকার করেন৷
সৌজন্য – সংবাদ প্রতিদিন, ৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৮।

Wednesday, October 3, 2018

আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম দত্তক নিল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ।


এক দিন বিশ্বভারতীর অংশ হবে চৌপাহাড়ি জঙ্গল সংলগ্ন তাঁদের গ্রামগুলিও। আশায় দিন গুনছিলেন আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের রুবি হেমব্রম, জিতেন মাড্ডি, সুনীল বেসরা ও ছোট্টু মুর্মুরা। গত শনিবার ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তাঁদের স্বপ্ন সত্যি হল।
চলতি বছরের ২৫ মে (২০১৮) বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এসে আচার্য তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে আসে গ্রামীণ পুনর্গঠনে কবিগুরুর দর্শনের কথা। তার পরই বিশ্বভারতীর অধীনে থাকা ৫০টি গ্রাম নিয়ে কাজ করার যেমন প্রশংসা করেছিলেন, তেমনই প্রতিষ্ঠানের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিশ্বভারতীর অধীনে আরও গ্রাম এনে সংখ্যাটা ১০০ থেকে ২০০ করার আহ্বান জানান। তাতে প্রাণিত হয়ে আরও ৫০টি গ্রামকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন কর্তৃপক্ষ।
গত শনিবার ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ জীবনব্যাপী শিক্ষা ও সম্প্রসারণ বিভাগের উদ্যোগে রামনগরে হওয়া একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রাথমিক ভাবে মোট ১০৬টি গ্রাম নিয়ে কাজ করা শুরু করল বিশ্বভারতী। কবিগুরু পল্লি-পুনর্গঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কুঠিবাড়িতে শুরু হয়েছিল ইনস্টিটিউট অফ রুরাল রিকনস্ট্রাকশনের কাজ। পরে তা নাম পায় শ্রীনিকেতন। শান্তিনিকেতন থেকে মাইল দুয়েক দূরে শ্রীনিকেতনেই প্রাণ পেতে থাকে কবিগুরুর গ্রামীণ ভাবনা। সেই সময় পার্শ্ববর্তী ৬টি গ্রামকে নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। ক্রমে সেই সংখ্যাটা হয়েছিল ৫০। জীবনব্যাপী শিক্ষা ও সম্প্রসারণ বিভাগ বর্তমানে বোলপুর-শ্রীনিকেতন ব্লক ও ইলামবাজার ব্লকের ৮টি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মোট ৫০টি গ্রাম নিয়ে কাজ করছিল। এ বার সেই সংখ্যাটা বেড়ে ১০৬ হল।
গ্রামের সার্বিক উন্নয়নে জীবনব্যাপী শিক্ষা ও সম্প্রসারণ বিভাগ রায়পুর, বিনুরিয়া, ইসলামপুর, পারুলডাঙা, বল্লভপুর, খোসকদমপুর, গোয়ালপাড়া সহ ৫০টি গ্রাম নিয়ে কাজ করছে। সার্বিক উন্নয়নের জন্য গঠন করা হয়েছে ৪০টি গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থা, ১২টি মহিলা সমিতি, ৩৬টি গ্রামীণ পাঠাগার। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় আলোচনা সভা, উৎসব-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে মানুষদের সচেতন করার কাজ চলছে। সুবিধার জন্য কয়েকটি গ্রাম নিয়ে ক্লাস্টার অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। ইলামবাজার চৌপাহাড়ি জঙ্গল সংলগ্ন আদিবাসী গ্রামই রয়েছে প্রায় ১২টি। ধল্লা, রাঙাবাঁধ, বনশুলি, খয়েরডাঙা, আমখই, লক্ষ্মীপুর, পুরাণঢিল সবই আদিবাসী গ্রাম। গ্রামগুলিতে সার্বিক উন্নয়নেরও প্রয়োজন রয়েছে। গত তিন বছর ধরে জঙ্গল সংলগ্ন আদিবাসী গ্রাম এবং লাভপুরের আদিবাসী গ্রামগুলিতে ডাইনি প্রথা নির্মূলেও কাজ করেছে বিশ্বভারতী। এ বার এই গ্রামগুলির দায়িত্ব নেওয়ার ফলে কাজ করা আরও সুবিধা হবে বলেই মনে করছেন কর্তৃপক্ষ।
এ দিন, রামনগর হুল মঞ্চে আদিবাসী সমাজে কুসংস্কার ও সামাজিক ব্যাধি এবং তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনাসভায় উঠে আসে শিশুশ্রমিক, নাবালিকা বিবাহ, ডাইনি প্রথা, ঝাড়ফুঁক প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধির কথা।
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য সবুজকলি সেন জানান, আগে থেকে যে সমস্ত গ্রামগুলি নিয়ে বিশ্বভারতী কাজ করে চলেছে সেগুলির মানসিক চেহারা বদলে গিয়েছে। নতুন গ্রামগুলিতেও তাই-ই হবে বলে আশাবাদী তিনি। ব্যাধি দূর করতে মহিলাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। আটটি মহিলা দলের হাতে দুটি করে ফুটবল তুলে দেওয়া হয়।
জীবনব্যাপী শিক্ষা ও সম্প্রসারণ বিভাগের প্রধান সুজিতকুমার পাল বলেন, ‘‘আমরা এই গ্রামগুলিতে আগেই ডাইনি প্রথা নির্মূলের উপরে কাজ করেছি। আপাতত সামাজিক সচেতনতা তৈরির উপরে কাজ হবে। ধীরে ধীরে গ্রামগুলির সার্বিক উন্নয়নের দিকে আমরা এগোব।’’
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, দেবস্মিতা চট্টোপাধ্যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

মাওবাদী হানায় নিহত ও নিখোঁজদের পরিবারকে চাকরি দেওয়ার দাবিতে শিলদায় অবরোধ।


মাওবাদী হানায় মৃত ও নিখোঁজদের পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের মৃত ঘোষণা করতে হবে। এই দাবিতে গত বুধবার ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শিলদায় ৫ নম্বর রাজ্য সড়ক অবরোধ করেন মাওবাদী হানায় নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজন। ইতিমধ্যে দাবি আদায়ের জন্য তাঁরা শহিদ ও নিখোঁজ পরিবারের যৌথমঞ্চ গঠন করেছেন। দাবি না মানা হলে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জানা গিয়েছে, ঝাড়গ্রাম জেলায় মাওবাদীদের হাতে ৩৪৩ জন নিহত হয়েছেন, ৮০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, প্রায় ১০০ জন আহত রয়েছেন।
এদিন সকালে প্রথমে বেলপাহাড়ি এলাকায় হাতে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে মিছিল শুরু হয়। মহিলারা সাদা ও কালো শাড়ি পরে মিছিলে হাঁটেন। পরে সাড়ে ১২টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত শিলদা মোড়ে ৫ নম্বর রাজ্য সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। সেখানে স্মরণসভা হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাওবাদীদের হাতে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ পরিবারই কিছু পায়নি। কিন্তু, যেসব মাওবাদী খুন করল তারা এখন চাকরি পেয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে। জঙ্গলমহলে অশান্তির সময় মাওবাদীরা খুন করার পাশাপাশি অনেককে তুলে নিয়ে গিয়েছে। আট থেকে দশ বছর হয়ে গেলেও তাঁদের কোনও খোঁজ নেই। যৌথমঞ্চের দাবি, নিহত ও নিখোঁজ পরিবারকে একটি করে সরকারি চাকরি দিতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মৃত বলে ঘোষণা করতে হবে। কেন্দ্র থেকে দশ লক্ষ টাকা ও রাজ্য থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ওইসব পরিবারের ব্যাঙ্কের কৃষি ঋণ মুকুব করতে হবে। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার জন্য সরকারি সাহায্য দিতে হবে। নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রীদের বিধবা ভাতা চালু করতে হবে।
গত জুন মাসে ঝাড়গ্রামে মিছিল করে তাঁরা জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছিলেন। শহিদ ও নিখোঁজ পরিবারের যৌথমঞ্চের সম্পাদক শুভঙ্কর মণ্ডল বলেন, ২০১২ সালে মুখ্যমন্ত্রী বেলপাহাড়িতে জানিয়েছিলেন, মাওবাদী হানায় যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারকে চাকরি দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মাওবাদীদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। যারা খুন করল, যারা দেশদ্রোহী, তারা চাকরি পেয়ে গেল। কিন্তু, যাঁরা খুন হলেন তাঁদের পরিবারকে কিছুই দেওয়া হল না। যাঁরা নিখোঁজ রয়েছে তাঁদের ডেথ সার্টিফিকেট দিতে হবে। দাবি পূরণ না হলে ২৯ অক্টোবর থেকে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি নেওয়া হবে। ওইদিন রাস্তায় মহিলারা থালা হাতে পথে নামবেন।
সৌজন্য – বর্তমান পত্রিকা, ০৪/১০/২০১৮। ছবি সৌজন্য – সংবাদ প্রতিদিন, ০৪/১০/২০১৮।