Wednesday, August 7, 2019

সাঁওতাল বিদ্রোহীদের সাহায্যকারী ঢেকারো সম্প্রদায়ের বর্তমানের করুণ কাহিনি।


ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাঁওতালদের সাহায্যকারী ঢেকারো সম্প্রদায়ের বর্তমানের করুণ কাহিনি

বীরভূম জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে এবং অন্যত্র ঢেকারো পদবি যুক্ত মানুষ জন বসবাস করেন। এই গোষ্ঠীর অনেকে নামের শেষে লোহারপদবিও লেখেন। ঢেকারো সমাজের এই সব মানুষজনকে আজও সমাজের একটা অংশ একটু অন্যদৃষ্টিতে দেখেন। পরাধীন ভারতে এই জনগোষ্ঠীকে অপরাধপ্রবণ শ্রেণি হিসেবে মনে করা হতো। ইতিহাসবিদদের একাংশ বলে থাকেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাঁওতালদের সাহায্য করেছিলেন ঢেকারো সম্প্রদায়ের মানুষ। সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনের পরে ইংরেজ সরকার এদের বিতাড়ন আরম্ভ করে, রুটিরুজি কেড়ে নিতে শুরু করে, অপরাধী বলে ঘোষণা করে। এর পর থেকে অসামাজিক কিছু ঘটলেই এদের জেলে পাঠানো হতো। ব্রিটিশ পুলিশ সেই আমলে ঢেকারোদের উপরে নানা অত্যাচার চালিয়েছে। এই গোষ্ঠীর বহু নিরীহ মানুষকে অনেক সময় বিনা অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মামলায় জেল খাটিয়েছে। দীর্ঘদিন জেলে আটকে রেখে নির্মম অত্যাচার করায় অনেক ঢেকারোর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও পুলিশি অত্যাচার অব্যাহত থাকায় জনমানসে ক্রমে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। ঢেকারো এবং সমগোত্রীয় কয়েকটি শ্রেণিকে অহেতুক অপরাধ-প্রবণ গোষ্ঠী রূপে যাতে দেখা না হয় এবং তাঁদের উপর হওয়া অত্যাচার ও শোষণ যাতে অবিলম্বে বন্ধ হয়, তার জন্য এ রাজ্য তথা দেশের বহু বিশিষ্ট মানুষ ও সমাজকর্মীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকেন। তাঁদের সার্বিক কল্যাণের কথা ভাবতে থাকেন তাঁরা।
অবশেষে গড়ে তোলা হয় পশ্চিমবঙ্গ ঢেকারো সমাজ কল্যাণ সমিতি১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর বিশেষ উদ্যোগে তাঁর বালিগঞ্জের বাড়িতে গঠিত হয় উক্ত সমিতি। প্রধান উপদেষ্টা হন মহাশ্বেতা দেবী। পেশায় শিক্ষক ও লেখক সুহাস দাসকে করা হয় উপদেষ্টা। সম্পাদকের দায়িত্ব পান বীরভূমের রাজনগরের সাহাবাদের বাসিন্দা তথা ঢেকারো সমাজের অন্যতম প্রতিনিধি শিবদাস লোহার। সভাপতির পদে আসীন হন রাজনগরেরই কানমোড়ার বাসিন্দা ডোমন ঢেকারো। শিবদাসবাবু জানান, ১৯৯৮ সালের ৩০ অগস্ট আমদাবাদের ছারানগরে ভারতের বিভিন্ন বিমুক্ত যাযাবর জনজাতির প্রথম মহা সম্মেলন আয়োজিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। ছিলেন কর্মসূত্রে আমেরিকায় অধ্যাপিকা, লেখিকা, অনুবাদক, সমাজকর্মী ও বক্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পীভাক।
ওই সম্মেলনে থাকতে পারায় আজও নিজেকে ধন্য মনে করেন শিবদাসবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘ঢেকারো সমাজের শিশু ও ছাত্রছাত্রীদের অধিকাশই বিভিন্ন দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। তাদের শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় একাধিক শিক্ষাকেন্দ্র। গায়ত্রী চক্রবর্তীর আর্থিক সহায়তায় এগুলি বেশ কয়েক বছর ধরে ভাল ভাবেই চলছে।’’ অতীতে একাধিক বার এমনকি গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে সফর সঙ্গী হয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাকেন্দ্র তথা স্কুলগুলি ঘুরে দেখার সুযোগ প্রতিবেদক মহম্মদ সফিউল আলমেরও হয়েছিল। আজও বছরে এক বা একাধিক বার সুদূর আমেরিকা থেকে ছুটে আসেন ওই মহিলা। খোঁজখবর নেন এই সব অবহেলিত শ্রেণির মানুষ ও তাঁদের বাড়ির শিশুদের। তাঁদের সার্বিক উন্নয়ন হোক এবং পড়ুয়ারা পড়াশোনা করে যথার্থ মানুষ হোক, তার জন্য তিনি সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন। বিদেশে থেকে যা আয় করেন, তার একটা বড় অংশ গায়ত্রী দেবী ভারতে এসে মূলত বীরভূমের ঢেকারো, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের খেড়িয়া শবর, লোধা শবরদের জন্য ব্যয় করে থাকেন নিঃস্বার্থ ভাবে। অতীতে মহাশ্বেতা দেবীর আদর্শে ও কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে গায়ত্রী দেবীর এই সমাজসেবায় নিজেকে সমর্পিত করা। ঢেকারো সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এবং দীর্ঘ কয়েক বছর এই সব সামাজিক কাজকর্মগুলি প্রত্যক্ষ করে অনেকখানি টের পাওয়া গিয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে লৌহ আকরিক থেকে লৌহ নিষ্কাশন করে ও তার মাধ্যমে অস্ত্র তৈরি করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সরবরাহ করতেন ঢেকারোরা। ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকারের রোষ নজরে পড়েন তাঁরা। তাঁদের অস্ত্র তৈরির কামারশাল বা ছোট কারখানাগুলি ধ্বংস করে দেয় ব্রিটিশ পুলিশ। শুরু করে ধরপাকড়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন এই জনজাতির মানুষজনকে পুলিশ-প্রশাসন অযথা হেনস্থা করবে, সেটাই প্রশ্ন অনেকের। অনেকে মনে করেন, এর শুরুটা সেই ব্রিটিশ আমলের তৈরি করা দুর্বৃত্ত আইন বা ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট। চুরি না করলেও ঢেকারোদের চোর, অপরাধ না করলেও তাঁদের অপরাধী তকমা দেওয়া হতো। পরে আইন ও আইনের বিভিন্ন ধারার রদবদল, সংযোজন, বিয়োজন ঘটলেও পুলিশ-প্রশাসনের একাংশের মানসিকতা আজও তেমন বদলায়নি বলে অভিযোগ। ফলে স্বাধীনতার এত বছর পরও এই শ্রেণির মানুষেরা অনেকখানি উপেক্ষিত অবহেলিত।
তবে মহাশ্বেতা দেবী ও তাঁদের মতো মানুষেরা এই শ্রেণির মানুষদের উপরে দশকের পর দশক চলতে থাকা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় এবং প্রশাসনিক স্তরে বারবার দরবার করায় কিছুটা হলেও মানসিকতায় বদল এসেছে। ঢেকারো  সমাজ কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজনগর গাংমুড়িতে সমিতির একটি অফিস করা হয়েছে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় মানুষেরা। আগে রানীগ্রামে অফিসটি ছিল। বর্তমানে গায়ত্রী দেবীর আর্থিক সহায়তায় চলা স্কুল বা শিক্ষাকেন্দ্রগুলি রাজনগর ব্লকের সাহাবাদ, টাবাডুমড়া, বেলেড়া, কানমোড়া, হরিপুর, সিউড়ির নাঙ্গুলিয়া, মহম্মদবাজারের বৈদ্যনাথপুর, রাসপুরের মতো এলাকাগুলিতে রয়েছে। বর্তমানে কয়েকটি কেন্দ্র সাময়িক বন্ধ, বাকিগুলি চলছে। দুজন পরিদর্শক রয়েছেন ধনঞ্জয় লোহার ও উজ্জ্বল লোহার। চার জন শিক্ষক ও চার জন শিক্ষিকা রয়েছেন বাচ্চাদের পড়ানোর দায়িত্বে। বই, খাতা, স্লেট, পেনসিল-সহ অন্য শিক্ষা সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় পড়ুয়াদের। মিড-ডে-মিলের ব্যবস্থাও আছে। এই সব পড়ুয়া আবার গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা শিশুশিক্ষা কেন্দ্র, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতেও যায় বলে বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা জানিয়েছেন।
রাজনগর কানমোড়া গ্রামের মেয়ে দুখসারি লোহার ২০০৩ সালে মহাশ্বেতা দেবীর চেষ্টায় ও সাহায্যে ঢেকারো সমাজ থেকে প্রথম মাধ্যমিক পাশ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর শ্বশুরবাড়ি, ঝাড়খণ্ডের নলা থানার ঘুসরোকাটায় থাকেন। ঢেকারো গোষ্ঠীর কয়েক জন বলছিলেন, ‘‘আমরা তফসিলি জাতি বা জনজাতি, কোনওটাই নই। ফলে, নানা সুযোগ সুবিধা থেকে আমরা সারা জীবন বঞ্চিত।’’ তবে কেউ কেউ জানান, ‘সাবকাস্টযাঁরা লোহার লেখেন তাঁরা এসসি সার্টিফিকেট পেলেও ঢেকারো পদবিযুক্তেরা তা পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন এই দাবি তাঁরা জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন মহলে।
এই বঞ্চিত, অবহেলিত শ্রেণির মানুষদের সার্বিক উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু সমাজকর্মী। আগামী দিনে আরও অনেক শুভানুধ্যায়ী এই ভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়ালে এই জনগোষ্ঠীর বর্তমান করুণ চিত্রটা অবশ্যই বদলাবে।
লিখছেন মহম্মদ সফিউল আলম। আনন্দবাজার পত্রিকায়, ৪ অগস্ট, ২০১৯।

Tuesday, July 30, 2019

যাদবপুরে পাঁচ বছরের আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ করে খুন।


যাদবপুর লোকসভার অন্তর্গত নরেন্দ্রপুরে পাঁচ বছরের আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ করে খুন, প্রমাণ লোপাট করতে মৃতদেহ পোঁতা হল বাগানে।

যাদবপুর লোকসভার অন্তর্ভুক্ত কেয়াদহ ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের বামনঘাটা এলাকায় এক ৫ বছরের আদিবাসী মুন্ডা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগ উঠল পড়শি এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রমাণ লোপাট করতে ছোট্ট একরত্তি মেয়েটির মৃতদেহ পাশের বাগানে পুঁতে দেয় অভিযুক্ত আজগর আলি। অভিযুক্ত আজগর আলি কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গত ১৫ জুলাই, ২০১৯ থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটির। ২০ জুলাই খোঁজ মিলল, তবে মৃতদেহের। বাড়ির কাছেই একটি বাগানের মধ্যে পোঁতা ছিল দেহটি। মাটি খুঁড়তেই পচা গন্ধে সকলের হাত নাকে উঠে আসে। গর্ত থেকে পচা-গলা দেহটি বের করে আনে পুলিশ। পাঠানো হয় ময়না-তদন্তে। ধৃত আজগারকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে।
নরেন্দ্রপুরের উত্তর খেয়াদহে আজগার মোল্লার বাড়ির পাশেই থাকত মেয়েটি। আদিবাসী পরিবারটিতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আজগারের। আজগার পেশায় ট্রাক চালক। ট্রাক নিয়ে বেরনো না থাকলেই পড়শির বাড়িতে আড্ডা মারতে আসত সে। পড়শির পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে এ দিক ও দিক ঘুরতেও যেত।
১৫ জুলাই সন্ধে থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পাঁচ বছরের মেয়েটির। আঁধার নেমে এলেও মেয়ে না ফেরায় চিন্তায় পড়ে যান বাবা-মা। পরের দিন সকালেও মেয়ে ফেরেনি। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে দুপুরে সোনারপুর-বামনঘাটা রোড অবরোধ করেন গ্রামবাসীরা। পুলিশ এলেও উত্তজেনা কমেনি। ইতিমধ্যে পড়শিদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে আজগারের উপর। প্রায়শই বাচ্চাটিকে নিয়ে তাকে ঘুরতে দেখেছে সকলে। আগের দিনও সন্ধের মুখে আজগারের সঙ্গেই মেয়েটিকে শেষ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আজগারের বাড়ি তালাবন্ধ। এক সময় গ্রামের মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। সকলে মিলে আজগারের বাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশের সামনেই আজগারের টালির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। ঘর থেকে সব কিছু বের করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
বাচ্চার সন্ধানে এরপর চিরুনি তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। খেয়াদহের পরিত্যক্ত এলাকা, বনবাদাড় বাদ যায়নি কিছুই। নামানো হয় স্নিফার ডগ। বাদ ছিল না ড্রোনও। তাতেও পাঁচ বছরের মেয়েটির কোনও খোঁজ মেলেনি। একই সঙ্গে আজগারেরও খোঁজ চালাচ্ছিল পুলিশ। অবশেষে শনিবার বারুইপুর জেলা পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ ও নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ সোনারপুর স্টেশন চত্বর থেকে আজগারের খোঁজ পায়। লাগাতার জেরায় ভেঙে পড়ে আজগার। খুনের কথা স্বীকার করে নেয়। সেই সঙ্গে জানায়, খুনের আগে মেয়েটিকে ধর্ষণও করেছিল সে।
পুলিশ জেরায় জানা যায়, ঘটনার দিন বেশ ভালো মতো মদ খেয়ে আজগর আলি পাশের বাড়িতে গিয়েছিল। বাচ্চাটি তাকে দেখে পেয়ারা খাওয়ায় বায়না ধরে। মেয়েটিকে পেয়ারা দেবে বলে দ্রুত কোলে তুলে পাশের বাগানে চলে আসে। সেখানেই আজগারের উন্মত্ত লালসার শিকার হয় মেয়েটি। যন্ত্রণায় ডুকরে কেঁদে ওঠে দুধের শিশুটি। তার কান্নার আওয়াজ চাপতেই মুখ চেপে ধরে আজগার। তাতেই দমবন্ধ হয়ে মারা যায় বাচ্চাটি। উপায় না দেখে বাগানেই বাচ্চাটিকে পুঁতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় আজগার। কয়েক দিন শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার বিভিন্ন স্টেশনে ঘোরাঘুরির পর অবশেষে শনিবার রাতে ধরা পড়ে যায়।
সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই ঘটনার কথা জানতে পেরে সন্তান হারানো পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন “সিধু কানহু বীরসা স্টুডেন্টস ফ্রন্ট” এর নেতা কর্মীরা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে পরিচয় দিয়ে কেয়াদহতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এক ব্যাক্তি রাস্তার ওপর থেকেই মেয়েটির বাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। তবে এই নৃশংস ঘটনা নিয়ে সেই ব্যক্তিটির মধ্যে সেরকম কোন ক্ষোভ বা খারাপ কোন অনুভূতি ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা লক্ষ্য করেননি। বেশ কিছুটা হাঁটার পর মেয়েটির বাড়ি। রাস্তার পাশে একটা এ্যাসবেসটাস দেওয়া দু কামরার বাড়ি। বাড়িতে তালা আটকানো। পাশের এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন যে ওরা এখানে সেদিনের পর থেকে আর থাকে না। তারা কুমোরপুকুরের দিকে একটি গ্রামে থাকছে। ঠিকানা জেনে ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা সেখানে পৌঁছলেন। গ্রামে ঢুকেই কিছু না বুঝতে পারায় এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন। সেই ব্যক্তি পারমিশানের কথা জিজ্ঞেস করেন। ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে উনি নিয়ে গেলেন। তার কাছ থেকে জানা যায়, এই গ্রামে সবাই মুন্ডা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস করেন।
মেয়েটির বাড়ি গিয়ে দেখা গেল তিন জন ভদ্রমহিলা আর এক বাচ্চা আছেন। মেয়টির বাবা বা দাদা কেউই ছিলেন না। ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের দেখেই দুই মহিলা জোরে বলে ওঠেন যে “আমারা কিছু বলতে পারবো না, মানা আছে। পার্টিই সব দেখবে বলেছে।” এই বলেই তাদের মধ্যে যিনি বয়স্ক মহিলা ছিলেন তিনি মুখ ঘুরিয়ে কান্না শুরু করে দেন।ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের আাদিবাসী হওয়ার পরিচয় দিয়ে, কথাবার্তা শুরু করতে গেলেও তিনি কিছুই বলতে রাজি হন নি।
ওখান থেকে ফেরার পথে ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা ভাবতে থাকেন যে ওই সর্বহারা আদিবাসী মেয়েটির পরিবার সুবিচার পাবে তো? নাকি দিনের পর দিন তাদের সাথে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে কুশমন্ডির আদিবাসী মেয়েটির মত। কেননা অনেক মানবাধিকার সচেতন সংগঠন এখনো ঘটনাটি নিয়ে তেমন সরব হয়নি। সত্যিই এই সরকার বিচার করবে তো? মেয়েটির পরিবার যেভাবে সন্ত্রস্ত, ভীত তারা কি সত্যিই বিচারের দাবিতে গলা উঁচু করতে পারবে? নাকি অভাবের সংসারে গরীব আদিবাসীদের নিরীহ মেয়েরা এভাবেই একে একে শেষ হয়ে যাবে ?
সংবাদ সৌজন্য – এই সময়, ২২/০৭/২০১৯ ও সিধু কানহু বীরসা স্টুডেন্টস ফ্রন্ট। ছবি - প্রতীকী

Monday, July 29, 2019

খেলার মাঠ নির্মাণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ আদিবাসীরা।


পশ্চিম বর্ধমান জেলার পাণ্ডবেস্বর ব্লকে আদিবাসী অধ্যুষিত মেটেল গ্রামে ফুটবল গ্রাউণ্ড, শেড ও স্টেজ নির্মাণের জন্য তিন বছর আগে শিল্যান্যাস করা হলেও এখনও নির্মাণ শুরু হল না। শিল্যান্যাস শিলাটি আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে। চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন এলাকার আদিবাসীরা।
এলাকার আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এক খেলার মাঠের। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে দাবিটি উপেক্ষিত থাকলেও পালা বদলের পর তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে একটি ফুটবল গ্রাউণ্ড, শেড ও স্টেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই মত শিল্যান্যাসও করা হয়। মোট বাজেট ধরা হয় ২৩ লক্ষ টাকা। পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের আর্থিক সহয়তায় এই ফুটবল গ্রাউণ্ড, শেড ও স্টেজ নির্মাণের কথা স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির। কিন্তু আজ তিন বছর হয়ে গেলেও ফুটবল গ্রাউণ্ড, শেড ও স্টেজ নির্মাণ হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওারির নজরে আনা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। 
সংবাদ সৌজন্য - সংবাদ প্রতিদিন, ৩০/০৭/২০১৯।

প্রয়াত নকশাল নেতা সন্তোষ রানার স্মরণসভায় একসঙ্গে ডান-বাম-ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক নেতারা।

প্রয়াত নকশাল নেতা ও আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সন্তোষ রানার স্মরণসভায় এক সঙ্গে যোগ দিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী ডান-বাম-ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক নেতারা।

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন নকশাল নেতা ও আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সন্তোষ রানা। গত শনিবার (২৭/০৭/২০১৯) প্রয়াত সন্তোষ রানার স্মরণসভার আয়োজন করলেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা। শনিবার দুপুরে ঝাড়গ্রাম শহরের দেবেন্দ্রমোহন মঞ্চে আয়োজিত ওই স্মরণসভায় ছিলেন বিভিন্ন বামপন্থী ও ঝাড়খণ্ডী সংগঠনের নেতারা। একই মঞ্চে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু ও তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য নেতা প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তাদের অনেকে তাঁদের সামনেই রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন।
এ দিন সিপিআইএমএল (রেড স্টার)-এর নেতা প্রদীপ সিংহঠাকুর তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আট বছর আগে যাঁরা রাজ্যের ক্ষমতা দখল করেছেন, তাঁরাও জঙ্গলমহলের আদিবাসী-মূলবাসীদের উন্নয়ন করতে পারেননি। একটা সবুজসাথী সাইকেল দিয়ে উন্নয়ন হয় না।’’ এত বছর পরেও জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা কেন মাতৃভাষায় উপযুক্ত ভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রদীপ। পরের বক্তা মন্ত্রী পূর্ণেন্দু অবশ্য এই প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু বলেননি। তিনি বলেন, ‘‘সন্তোষদা নেই। তবে তাঁর কাছ থেকে আমাদের এখনও অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যের দোষ দেখার আগে নিজেকে ভাল করে বিচার করা উচিত। সন্তোষদার কাছে থেকে এটা আমি শিখেছি।’’ পূর্ণেন্দুর মতে, শাসক না হলেও কমিউনিস্টরা এক ধরনের শাসন চালান এবং সেখানে গণতন্ত্র কন্ঠরুদ্ধ হয়। এটা সন্তোষ রানা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।  তাঁর কথায়, ‘‘বিপ্লব বহমান, ঝটকা আসে। অনেক পরিবর্তন হয়। তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা খুঁজে এগিয়ে চলা হচ্ছে বিপ্লবের দিকে এগোবার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় প্রশ্ন। সেই চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে সন্তোষদা সহায়ক হতে পারেন। এটাই তাঁর আজকের প্রাসঙ্গিকতা।’’
এ দিন অন্যদের মধ্যে ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সিপিএমের প্রবীণ নেতা ডহরেশ্বর সেন, ঝাড়গ্রামের প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ রূপচাঁদ মুর্মু, ঝাড়খণ্ড অনুশীলন পার্টির নেতা আদিত্য কিস্কু, অসিত খাটুয়া, আদিবাসী কুড়মি সমাজের নেতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো প্রমুখ।
একই মঞ্চে অন্য বক্তা রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে গেলেও তিনি সেই সরকারের মন্ত্রী হিসেবে কিছু বললেন না কেন? এই প্রশ্নের জবাবে পূর্ণেন্দুর উত্তর, ‘‘সন্তোষ রানার স্মরণসভায় এসেছি। কারও বিরোধিতা করা আত্মপক্ষ সমর্থনের জায়গা এটা নয়। মানুষই শেষ কথা বলবে।’’
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ জুলাই, ২০১৯।

আধুনিক বিলাসিতার লোভে স্বেচ্ছায় দেহব্যবসায় নামছে স্কুলছাত্রীরা, চিন্তা বাড়ছে পুলিশের।


বছর পনেরোর মেয়েটার বাবা নেই। মা শয্যাশায়ীদুই দিদি আছে, কিন্তু তারা কিছু করে না। তাই সংসার চালানোই দায়। ফলে মেয়েটাকে একদিন কাজের কথা বলে এক পড়শি। তার সঙ্গে মেয়েটিও এদিক সেদিক যাওয়া আরম্ভ করল। একদিন একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল মেয়েটিকে। তাকে একটি ঘরে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে দেওয়া হল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন খদ্দের হাজির। মেয়েটি ধর্ষিত হল। ওর হাতে সামান্য টাকা গুঁজে দিয়ে চলে গেল দুটি লোক। মেয়েটিকেও বাড়ি যেতে দেওয়া হল। কিন্তু ভয় দেখানো হল, আবার না-এলে সবাইকে সব বলে দেওয়া হবে বলে। দিনে প্রায় কুড়ি জন খদ্দের সামলে এক বছর পর মেয়ে যখন অসুস্থ, তখন ব্যাপারটা ধরতে পারলেন তাঁর মা। খবর গেল কলকাতা পুলিশের মানব পাচার বিরোধী শাখায়। অতঃপর কলকাতা পুলিশ ও ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন মেয়েটিকে উদ্ধার করে একটি বাড়ি থেকে। গ্রেপ্তার হয় দুই যৌনকর্মী, যারা মেয়েটিকে দিয়ে দেহব্যবসা করাত।
এ ভাবেই শহর কলকাতা ও গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ছে কমার্শিয়াল সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়েটেশনবা সিএসই। তবে তা শুধু গরিব, অসহায় মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এখানে সামিল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ঘরের স্কুলের মেয়েরাও। এবং তা ইচ্ছার বিরুদ্ধে নয়!
চমকানোর কিছু নেই। কলকাতা পুলিশের তথ্যই বলছে, হুড়মুড়িয়ে বেড়েছে সিএসই। ১০ বছর আগে যা ছিল, সে তুলনায় লাফিয়ে বেড়েছে এই প্রবণতা। আগে যেখানে বিষয়টা এক্কেবারে আড়ালে-আবডালে হত, এখন রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে চলে এই ব্যবসা।
এই স্কুলের মেয়েদের কিন্তু কেউ ভুলিয়ে আনছে না। তারা আসছে নিজে থেকে। এটা তাদের পার্ট টাইমকাজ। এতে যা পয়সা রোজগার হয়, তা দিয়ে তারা তাদের শখ মেটায়। যেমন ফোন-ট্যাব কেনা, ভালো পোশাক কেনা, নামি পাঁচতারা হোটেলে খাওয়া, এক কথায় হাইফাই লাইফস্টাইলের জন্যই তারা এ পথ বেছে নিচ্ছে। আর এসব দেখে ওত পেতে থাকে দালালচক্রও। বছরখানেক আগে একটি মধুচক্রে হানা দিয়ে পুলিশ ১৬ জন স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করে। তারা প্রত্যেকেই ছিল স্কুল ইউনিফর্মে। সাম্প্রতিক কালে এই ধরনের অভিযোগ বাড়ছে বলে জানাচ্ছে এ নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন।
পুলিশ সূত্র বলছে, এর বাইরেও মেয়েদের ফাঁদে ফেলার উপায় আছে। এক অফিসারের কথায়, ‘লক্ষ্য করে দেখবেন, আজকাল মনের মতো বন্ধু পানবলে মোবাইলে ও কাগজে নানা বিজ্ঞাপন আসে, মাস্যাজ পার্লারের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে থাকে রাস্তা ঘাট। এর অধিকাংশই সিএসই-র জন্য। যেখানে বেশ ভালো টাকার বিনিময়ে শরীর কেনাবেচা হয়। আর সেখানে টার্গেট মূলত স্কুলের মেয়েরাই।
সিএসই-র এই রমরমা কপালে ভাঁজ ফেলেছে পুলিশের। কলকাতা পুলিশের এক শীর্ষকর্তার কথায়, ‘এর সঙ্গে ভোগবাদেরও যোগ রয়েছে। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা এখন নানা গ্যাজেটে মজে। রয়েছে লাক্সারি জীবনের হাতছানি। যেই মুহূর্তে সেগুলো তারা পাচ্ছে না, তারা সহজে আয়ের পথ খুঁজছে। এবং সেখানে সিএসই-র মোকাবিলা করা খুবই কঠিন।
কাউন্সেলিং করাতে গিয়ে পুলিশের যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা ভয়াবহ। এই মেয়েরা মনেই করছে না, তারা কোনও অপরাধ করছে। তাদের সাফ কথা, এতে অন্যায়ের কী আছে! যারা ভুলটা বুঝতে পারছে, তাদের সংখ্যাটা হাতেগোনা।
পুলিশের মতে, একা কোনও পক্ষই কিছু করতে পারবে না। একসঙ্গে কাজ করতে হবে পুলিশ, এনজিও এবং অভিভাবকদের। নজর রাখতে হবে বিজ্ঞাপনে, বিভিন্ন পার্লার, লজ, হোটেল, প্রাইভেট রেসিডেন্স, সহ সর্বত্র। সর্বোপরি সচেতনতা বাড়াতে হবে স্কুলের বাচ্চাদের।
সংবাদ সৌজন্য – এইসময়, অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়, ২৯/০৭/২০১৯।

রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যৌন পল্লীতে বিক্রি হল ১৫ বছরের কিশোরী।


বাড়ি থেকে ঝগড়া করে পালিয়ে এসেছিল ১৫ বছরের কিশোরী মনীষা (নাম পরিবর্তিত)। এই ভুলের চরম মাসুল দিতে হল মেয়েটিকে। নিজের অজান্তেই চারটি যৌন পল্লীতে বিক্রি হয়ে যায়।
বাড়ি থেকে পালিয়ে শিয়ালদহ রেল স্টেশনে এসে মনীষা যখন এদিক-সেদিক ঘুরছে, তখন পাপ্পু নামে এক ব্যক্তি মনীষাকে চাকরির টোপ দেয়। বলে রাজস্থানের ঝুনঝুনুতে ভালো কাজআছে। গরিব পরিবারের মেয়েটি আপত্তি করেনি। সে পাপ্পুকে বিশ্বাস করে তার সঙ্গে সেখানে চলে যায়। গিয়েই বুঝতে পারে ভালো কাজমানে দেহব্যবসা। মনীষাকে পাপ্পু একটি যৌনপল্লিতে বিক্রি করে পালিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে বেশি দিন ঠাঁই হয়নি মনীষার। ফের তাকে বিক্রি করা হয়। এ বার এলাহাবাদে। সেখানে দিন কয়েক থাকার পর দিল্লির সোনাগাছিজি বি রোডে। সেখানে সপ্তাহ দুই কাটিয়ে এ বার ঠাঁই হয় এলাহাবাদের এক যৌনপল্লিতে। জি বি রোড থেকেও মনীষাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অবশেষে ফের হাতবদল হয়ে তার ঠাইহয় শিলচরের এক যৌনপল্লি।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজস্থান, সেখান থেকে এলাহাবাদ (প্রয়াগ রাজ), তার পরে দিল্লি, ফের এলাহাবাদ হয়ে শিলচর, ক্লাস নাইনে পড়া ১৫ বছরের মেয়েটার জীবনের গত দুই মাস এই ভাবেই যন্ত্রণার মধ্যে কেটেছে। একের পর এক হাতবদল হয়েছে। প্রত্যেক বারই সে যৌনপল্লিতে বিক্রি হয়ে গেছেঅতঃপর স্বাধীনতার স্বাদ এল গত ২৬শে জুলাই, যেদিন উত্তর ২৪ পরগনা পুলিশ ও অসম পুলিশের যৌথ অভিযানে ক্লাস নাইনের মেয়েটা উদ্ধার হল।
১৫ বছরের কিশোরী মনীষা এত জায়গায় বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তাকে খুঁজে পেতে পুলিশকে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়। সূত্র ছিল, একটি মাত্র মোবাইল নম্বর। মনীষা মে মাসের ২৩ তারিখে বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে যায়। তার পর বহু জায়গায় তার খোঁজ করে পরিবার। কিন্তু কোথাও মেয়েকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় থানায় এফআইআর দায়ের করে তারা। তবে প্রথম যাত্রায় পুলিশও কিছু করতে পারেনি। অবশেষে সূত্র মেলে। ১৮ জুন নাগাদ মনীষা অন্য কারও মোবাইল থেকে লুকিয়ে ফোন করে বাড়িতে, বাঁচানোর জন্য করুণ আর্তি জানাতে থাকে। সক্রিয় হয়ে ওঠে উত্তর ২৪ পরগনা পুলিশ ও মধ্যমগ্রামের এনজিও সৃষ্টির পথে।তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, মোবাইল নম্বর ট্র্যাক করে জানা যায়, সেটি দিল্লির জি বি রোডের কোনও একটি অঞ্চল। গ্রাহকের নাম ও ঠিকানাও সেখান থেকে বের করে তারা। জানা যায়, ফোনটি নেহা নামে কারও এক জনের। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায় ঠিকানাটা ভুয়ো। এবং দিন কয়েকের মধ্যে মোবাইলটি অফ করে দেওয়া হয়। যদিও তাতেও হাল ছাড়েনি পুলিশ। তারা এ বার আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে ফোনের অবস্থানে নজরদারি চালাতে থেকে। ইতিমধ্যে চলতি মাসের ১৩ তারিখ দিল্লির জি বি রোডে হানা দেয় দিল্লি পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শক্তিবাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু মনীষাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তার দুদিন পরে ১৫ তারিখ বাংলা পুলিশ জানতে পারে ওই মোবাইলে নয়া সিম ভরে ব্যবহার করছেন দিল্লির সাগরপুর এলাকার শান্তি বলে কেউ এক জন। বাংলা ও দিল্লি পুলিশ এবং শক্তিবাহিনী গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিনি জানান, জি বি রোডের কোঠা নম্বর ৫৬-র বাসিন্দা নেহা ওরফে রাধিকার থেকে তিনি ফোনটি কিনেছেন। তিনি আর কিছু জানেন না। ফলত, পরের দিন সেখানে হানা দেয় পুলিশ। এবং নেহাকে গ্রেপ্তার করে। শান্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। নেহা জেরায় জানায়, মনীষাকে সে এলাহাবাদে বিক্রি করে দিয়েছে। পুলিশ চাইলে নেহাকে উদ্ধারে সে সহায়তা করবে।
এর পরের গন্তব্য ছিল এলাহাবাদে মৈলি তামাংয়ের বাড়ি। পুলিশকে মৈলি জানায়, মনীষাকে সে শিলচরে বিক্রি করে দিয়েছে। বাংলা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এর দিন কয়েক পর ২৬ তারিখ এই ঘটনার তদন্তকারী পুলিশ অফিসার তাঁর টিম নিয়ে শিলচরে যান। সেখানে অসম পুলিশের সহায়তায় মেয়েটিকে যৌনপল্লি থেকে উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় যৌনপল্লির অন্যতম মালকিন স্বপ্না দাসকে। তদন্তকারী অফিসার জানিয়েছেন, তাঁরা মনীষাকে নিয়ে ৩০ তারিখ ফিরবেন। ফিরে এসে মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষা হবে ও সিডব্লিউসি-র সামনে পেশ করা হবে।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে দিল্লির স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শক্তিবাহিনীর সদস্য ঋষিকান্ত বলেন, ‘পাচার যে কী সুসংহত ভাবে হচ্ছে, এটা তার প্রমাণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অনুরোধ করব, পাচারকারীরা যেন কোনও মতেই জামিন না পায়, তাতে তদন্তে সমস্যা হয়। রাজ্য পুলিশ এ ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করেছে।
মনীষা এখনও মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। তবে তার মধ্যেও সে জানিয়েছে, ফিরে এসেই ফের স্কুলে যেতে চায় সে। সেটাই তাকে আলো দেখাবে।
সংবাদ সৌজন্য – এইসময়, অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়, ২৯/০৭/২০১৯।

Sunday, July 28, 2019

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলাতে বন্ধ বাড়ির ভেতর থেকে আদিবাসী যুবকের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার।

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলাতে বন্ধ বাড়ির ভেতর থেকে আদিবাসী যুবকের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করল পুলিশ, খুনের অভিযোগ তুলে তির-ধনুক হাতে আন্দোলনে নামল স্থানীয় আদিবাসীরা।

গত শনিবার ২৭/০৭/২০১৯ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলার কুসুমদা পঞ্চায়েতের বীরসিংহপুর গ্রামের এক বন্ধ বাড়ির ভেতর থেকে স্থানীয় যুবক সূর্যকান্ত হেমব্রম (২৪)-এর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ২৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ ছিলেন সূর্যকান্ত। ছেলেকে খুন করা হয়েছে বলে বাড়ির মালিক শেখ মইদুল ও তাঁর বাবা শেখ মহসিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন মৃতের মা সারমণি হেমব্রম।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। তাঁকে খুন করা হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় আদিবাসীরা পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরে পুলিশের আশ্বাস পেয়ে অবরোধ তুলে নেন আদিবাসীরা।
মৃত যুবককে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও শুরু হয়ে গিয়েছে। দোষীদের শাস্তির দাবিতে এ দিন পিংলার মুণ্ডমারিতে গ্রামবাসীদের পথ অবরোধ চলাকালীন সেখানে পৌঁছন বিজেপির জেলা সভানেত্রী অন্তরা ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “এলাকার লোক বলেছে ওই যুবক আমাদের দলের কর্মী। আর যাঁর বাড়ি থেকে দেহ পাওয়া গিয়েছে তিনি তৃণমূলের কর্মী। আমাদের ধারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই খুন করা হয়েছে।” ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন সিপিএম নেতারাও। দলের এরিয়া কমিটির সম্পাদক কালীপদ মান্ডির দাবি, “ওই যুবকের পরিবার আমাদের দলের সমর্থক। ওঁর কোনও শত্রু ছিল না। রাজনৈতিক অভিসন্ধি থাকতে পারে।” তৃণমূলের ব্লক সভাপতি শেখ সবরাতির বক্তব্য, “যাঁর বাড়ি থেকে দেহ পাওয়া গিয়েছে তিনি পিংলায় থাকনে না। তাই আমাদের দলের কর্মী কিনা জানা নেই। অকারণে ঘটনায় তৃণমূলকে জড়িয়ে রাজনীতির চেষ্টা হচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্রে খবর, বাবা চরণ হেমব্রমের সঙ্গে চাষবাস করতেন সূর্যকান্ত। বছর তিনেক আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। বছর দু’য়েকের ছেলেও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে খবর, দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী এই পরিবার সিপিএমের কৃষক সংগঠনের সমর্থক। গত ২৪ জুলাই পাশের গ্রাম মোহনপুরে বন্ধুর বিয়েতে যাবে বলে বেরিয়েছিলেন সূর্যকান্ত। দু’দিন পরেও বাড়ি না ফেরায় শুক্রবার খোঁজখবর শুরু করে পরিবার। তবে খোঁজ মেলেনি। এ দিন ভোরে স্থানীয় ফুলচাষিদের কয়েকজন দেখেন, শেখ মইদুলের বন্ধ বাড়ি থেকে পচাগলা দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। অভিযোগ, পুলিস মৃতদেহ উদ্ধারের সময় বাসিন্দাদের কিছু জানায়নি। পরে জানা যায়, ওই মৃতদেহ এলাকার নিখোঁজ যুবক সূর্যকান্ত হেমব্রমের। পরে থানায় গিয়ে সূর্যকান্তের মা সারমণি দেহ শনাক্ত করেন। পরে বাড়ির মালিক শেখ মইদুল ও তাঁর বাবা শেখ মহসিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন মৃতের মা সারমণি হেমব্রম। মৃতের পড়শি বিধান মান্ডি বলেন, “সূর্যকান্তকে প্রথমে মাথায় লাঠি দিয়ে মেরে তার পরে বিদ্যুতের তার হাতে জড়িয়ে খুন করা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করুক।”
খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজি সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, “ঘটনার তদন্ত চলছে। যাঁর বাড়ি থেকে দেহ পাওয়া গিয়েছে তাঁকেও জেরা করা হচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী মামলা হবে।”
মৃত যুবকের মা সারমণি বলেন, “গত বুধবার বিয়েবাড়ি যাবে বলে আমার থেকে দশ টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল ছেলে। কিন্তু আর ফিরল না। মনে হচ্ছে ওকে খুন করেছে শেখ মইদুল ও তার বাবা মহসিন। ওদের শাস্তি চাই।”
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা ও বর্তমান পত্রিকা, ২৮ জুলাই, ২০১৯। ছবি সৌজন্য - সারি কাথা।