Saturday, April 13, 2019

গুজরাট ও রাজস্থানের আদিবাসীদের আওয়াজ হয়ে উঠছে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি


গুজরাট ও রাজস্থানের আদিবাসীদের আওয়াজ হয়ে উঠছে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)২০১৭ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র ১ মাস আগে ছোটু ভাই ভাসাবা এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)গঠনের এক মাসের মধ্যে অনুস্থিত গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন ২০১৭ এ দুটি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)এর পর ২০১৮ সালে অনুস্থিত রাজস্থান বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করে ২ টি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)
এবার ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে গুজরাট রাজ্য থেকে ৭ টি লোকসভা আসনে লড়াই করছে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)রাজস্থান রাজ্য থেকে ৫ টি লোকসভা আসনে লড়াই করবে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)
এছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র, ও উড়িষ্যা রাজ্যে লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করবে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)
সারা দেশে প্রায় ২০ টি লোকসভা আসনে লড়াই করছে ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP)
ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি (Bharatiya Tribal Party - BTP) এর সকল লোকসভা প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানাই।

আজও এমজিআর-এ আটকে তামিলনাড়ুর দলিত-আদিবাসী প্রবীণরা, নবীনদের নজর কিন্তু ভবিষ্যতে।

ডান হাতে উল্কি করা জোড়া পাতা দেখিয়ে রাগত স্বরে কিছু একটা বলে উঠলেন প্রৌঢ়। সব কথা বুঝতে না পারলেও এমজিআরশব্দটা কানে আটকে গেল। নাগাপত্তিনাম পুর এলাকার সৈকত থেকে সাগরের পাড় ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই নাম্বিয়ার নগর। সৈকতের উপরই সারি দিয়ে রাখা রয়েছে মাছধরা নৌকো। মাথার উপর সূর্য জ্বলছে। তাপ থেকে বাঁচতে বালিতে চারটে খুঁটি পুতে উপরে নারকেল পাতা দিয়ে ঢেকে মৎস্যজীবীদের অস্থায়ী বসার জায়গা। সেখানেই দেখা হল ওই প্রৌঢ় এস রবিকুমারের সঙ্গে। গাড়ির চালক রাজার সাহায্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম গত বছরের গাজা সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে। রবিকুমার যেখানে বসেছিলেন, তার পিছনেই তাঁর গ্রাম। তিনি গ্রামের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘‘গোটা গ্রামটাই চলে গিয়েছিল জলের তলায়। সমুদ্র সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল গ্রামের সব কিছু।জানা গেল, ক্ষতিপূরণ তেমন কিছুই পাননি। মাছ ধরা নৌকোর মালিকরা নৌকোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য পেয়েছিলেন ৩০ হাজার টাকা করে।
কথা প্রসঙ্গেই উঠে আসে ভোটের কথা। এক গাল হেসে রবিকুমার বলেন ‘‘এআইএডিএমকে’’। অর্থাৎ তিনি এআইডিএমকে-কেই ভোট দেবেন। আর সেই কথা শুনেই কিছু বলেন রবিকুমারের পাশে বসা যুবক সেলভা কুমার। আর তাতেই রীতিমত রেগে গিয়ে নিজের হাতের উল্কি করা এইআইএডিএমকে-র নির্বাচনী প্রতীক জোড়া পাতা দেখিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন সেলভার কথার। একই গ্রামে বাড়ি সেলভার। কয়েক ঘণ্টা আগেই সমুদ্র থেকে ফিরেছেন প্রায় দুদিন পর। সেলভার কাছেই জানলাম, প্রায় আট হাজার মানুষের বাস ওই গ্রামে। কিন্তু গ্রামে কোনও পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। সেলভার বলেন, ‘‘আমাদের বাইরে থেকে জল কিনে খেতে হয়। সরকারি কোনও জলের সরবরাহ নেই এখানে। মাটি খুড়লেও নোনা জল। তাই কেনা জলই ভরসা এই মৎস্যজীবী পরিবারগুলির।
নাগাপত্তিনম শহরের স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া সেলভা এবং তাঁর সমবয়সী রাজকুমার মজা করেই বলেন, ‘‘এখানে নৌকোর বিমা আছে। কিন্তু আমাদের কোনও জীবন বিমা নেই।শুধু নাম্বিয়ার নগর নয়, নাগাপত্তিনম জেলাতেই রয়েছে মৎস্যজীবীদের এ রকম ৬৮টি গ্রাম। সবারই একই অবস্থা বা আরও খারাপ। তামিলনাড়ু রাজ্যের গোটা পূর্ব দিকটাই সমুদ্র। কয়েক লাখ মৎস্যজীবীর বাস সেই সৈকতে। সেলভার কাছে জানলাম, বালির উপর সারি দেওয়া নৌকোর মালিক তাঁরা নন। মালিককে ভাড়া দিয়ে নৌকো নিয়ে তাঁরা মাছ ধরতে যান। সেলভা বলেন, ‘‘এই ফাইবারের মাছধরা নৌকো জলে নামাতে খরচ প্রায় তিন লাখ টাকা। তার মধ্যে লাইসেন্স বানাতেই চলে যায় এক লাখ। কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে আমরা ঋণ পাই না।তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেলভারা অন্যের নৌকো ভাড়ায় নিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে সারা মাসে কোনও মতে বাড়ি নিয়ে আসেন ১২-১৫ হাজার টাকা।
রবিকুমার বা সেলভাদের আগের প্রজন্মের মানুষ সেই উপেক্ষা’-র জীবন মেনে নিয়েই ভোট দেওয়ার অধিকার পাওয়া ইস্তক দেবতা জ্ঞানে সমর্থন করছেন এআইডিএমকে-র প্রতিষ্ঠাতা এমজি রামচন্দ্রণ বা এমজিআর-কে। তাঁদের কাছে এমজিআর এবং জোড়া পাতা প্রতীকই যথেষ্ট। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম এর বিরোধী। সেলভার কথাতেই ফুটে উঠছিল তাঁর ক্ষোভ, ‘‘নো বিজেপি, নো আম্মা, বিজেপি ব্যাড।
নাগাপত্তিনামের সৈকত থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমঘাটের পাদদেশেও কদিন আগেই শুনেছি একই কথা। আনাইমালাই পাহাড়ের কোলে প্রত্যন্ত গ্রাম ঝাওয়াড়ু এবং পুডুরনাড়ু। ঝাওয়াড়ুর ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় প্রায় ৪৫ হাজার ভোটার। পুদুরনাড়ুর আরও ১৫ হাজার। গত চার দশকে এখানকার আদিবাসী জনজাতির মানুষদের কাছে এমজিআর নামটাই যথেষ্ট। জোড়া পাতার প্রার্থীকে প্রচারেও আসতে হয় না এখানে। ৬৩ বছরের এ ঠুক্কনের কথায় এমজিআর ভগবানতুল্য। ১৯৭৭ সালে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই রাজ্যের উত্তর পশ্চিম দিকের পার্বত্য এলাকার আদিবাসী জনজাতি মানুষদের বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলেন এমজিআর। সরকারি আবাসিক স্কুল তৈরি করা হয়। সেখানে বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন আদিবাসী জনজাতির ছাত্রছাত্রীরা। ঠুক্কনও তাঁদের একজন। তাঁর কথায়, ‘‘এমজিআর যা করেছেন তাঁদের জন্য, সেই ঋণ শোধ করার একমাত্র সুযোগ মেলে ভোটের সময়।
একই কথা শুনেছিলাম তিরুভান্নামালাই থেকে আরণি যাওয়ার পথে নারকেল বিক্রেতা কুপ্পুস্বামীর কাছেও। কিন্তু ঠুক্কন-কুপ্পুস্বামীর পরবর্তী প্রজন্ম এমজিআর নামে আর আটকে থাকতে নারাজ। তামিলনাড়ু উপজাতি-জনজাতি সংগঠনের সহ-সভাপতি পি সম্মুগম। তিনি বলেন,‘‘ এই প্রজন্ম বদলেছে। তাঁরা গোটা দেশের খবর রাখছে। তাঁরা বিচার করছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ।তাই ঠুক্কনের নাতি, যে সবে এ বছরই ভোটাধিকার পেয়েছে, পরিবারের বড়দের বোঝাতে চাইছে জোড়া পাতার সঙ্গী বিজেপির পদ্মফুল... নোটবন্দি থেকে জিএসটি সব হয়েছে বিজেপির আমলে... জোড়া পাতায় ভোট দিলে ফের আসবে সেই পদ্মফুল... ক্ষতি হবে আম-আদমীর। ঠুক্কনের নাতির কথায় নাগাপত্তিনমের সেলভার প্রতিফলন। তাঁদের আপত্তি বিজেপি নিয়ে। জোড়া পাতার জোটসঙ্গী বিজেপি। তাই এ বার তাঁরা জোড়া পাতায় ভরসা করতে পারছেন না।
তবে কি বিন্ধ্য পর্বতের বেড়া ডিঙিয়ে দাক্ষিণাত্যেও পরিবর্তনের হাওয়া? দ্রাবিড় রাজনীতির স্বাভিমান ভেঙে দিল্লিতে চোখ নতুন প্রজন্মের। আনুগত্য বনাম বাস্তবতার লড়াই এ বার গোটা তামিল প্রদেশে এনে দিয়েছে রাজনীতির লড়াইয়ে এক নতুন মাত্রা।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, সিজার মণ্ডল, ১৩ এপ্রিল, ২০১৯।

জল-মুদি বন্ধ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মস্থানেই একঘরে সাত দলিত পরিবার, ভোটেও ‘টোটালি বয়কট’।


জল-মুদি বন্ধ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মস্থানেই একঘরে সাত দলিত পরিবার, ভোটেও টোটালি বয়কট। গ্রামে দোকান রয়েছে। অথচ একটা দেশলাই বা সামান্য লবণটুকু কিনতে বাবুভাইদের যেতে হয় চার কিলোমিটার দূরের খেরালুতে।

বাবুভাই সেনমা এ বার ভোট দেবেন না। টোটালি বয়কট এই দুটো শব্দ বড্ড জোর দিয়েই উচ্চারণ করলেন। আর হ্যাঁ, এটাও না বলে পারলেন না, খোদ নরেন্দ্র মোদীর নিজের জেলাতেই যদি আমাদের এমন দশা হয়, তা হলে বুঝতেই পারছেন...
মেহসানা জেলা সদর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে নন্দালি। সম্পন্ন গ্রামই বলা যায়। পটেল, ঠাকোর, প্রজাপতি, রাজপুত সবাই মিলিয়ে-মিশিয়ে। তার সঙ্গে সাত দলিত পরিবারও ছিল। হ্যাঁ, ছিল। কারণ, সেই সাতের মধ্যে দুই পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর বাবুভাইদের মতো যে পাঁচ পরিবার রয়েছে, তারা কোনও রকমে উপেক্ষা-অবহেলা নিয়ে গ্রাম কাটাচ্ছে। কারণ, গোটা গ্রাম তাদের বয়কটকরেছে।
গ্রামে দোকান রয়েছে। অথচ একটা দেশলাই বা সামান্য লবণটুকু কিনতে বাবুভাইদের যেতে হয় চার কিলোমিটার দূরের খেরালুতে। গ্রামে কুয়োয় জল নেই। আছে ডিপ টিউবওয়েল। সেখান থেকে জল নেওয়া একেবারেই বারণ তাঁদের। পাশের গ্রাম থেকে আনতে হয়। গ্রামে সব রাজনৈতিক দলেরই কয়েক জন করে নেতা আছেন। তাঁরা কেউই বাবুভাইদের কাছে ভোট চাইতে আসেননি। না, কোনও দলই নয়। গ্রামে সেলুন আছে। কিন্তু বাবুভাইদের চুল-দাড়ি কাটতে যেতে হয় সেই খেরালুতেই। এ গ্রামে তাঁরা ক্ষৌরকার্য থেকেও বঞ্চিত।
২০১৬-র এপ্রিল থেকে এমন ভাবেই দিন কাটাচ্ছে নন্দালির সাত দলিত পরিবার। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে দুটো পরিবার অন্য গ্রামে চলে গিয়েছে। কিন্তু বাবুভাইরা এখনও থেকে গিয়েছেন, দাঁতে দাঁত কামড়ে। এখনও কোনও বদল হয়নি। নন্দালির অন্য বাসিন্দারা এই বিষয়ে একটি কথাও বলতে চান না। রাস্তায় যে দুএক জন ছিলেন, তাঁরা প্রশ্ন শুনে নীরবে এগিয়ে গিয়েছেন। বাবুভাইয়ের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা পাড়তেই শোনা গেল, ‘‘এখন বিশ্রামের সময়। কথা বলা যাবে না।’’
কেন এই বয়কট? বছর পঞ্চাশের বাবুভাই বলছেন, ওই এপ্রিলে মেহসানা জেলা উদ্যোগ কেন্দ্রে গিয়েছিলেন পুত্রবধূর জন্য একটা সেলাই মেশিনের আবেদনপত্র নিয়ে। সরকারি প্রকল্পেই ওই মেশিন পাওয়া যায় বলে শুনেছিলেন। তাঁর কথায়: ‘‘যে সরকারি কর্মীর কাছে ওই আবেদনপত্র জমা দিতে গেলাম, তিনি নন্দালির বাসিন্দা। কিন্তু ওই কর্মী আমার আবেদনপত্র না নিয়ে জানিয়ে দিলেন, কপিলা সেনমা মানে আমার পুত্রবধূ সেলাই মেশিন পাবেন না। কেন? জি়জ্ঞেস করায় উনি চটে যান। তার পর দুএক কথায় বচসা বেধে গেল। আমার গালে একটা চড় কষিয়ে দিলেন ওই সরকারি কর্মী! আমি দলিত তো, আমাকে মারাই যায়, তাই না!’’ এর পর বাবুভাই জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করে ওই কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
বাবুভাই জানালেন, ওই সরকারি কর্মী এর পর গ্রামে ফিরে সমস্ত গ্রামবাসীকে একত্রিত করে সাত দলিত পরিবারকে বয়কটের দাবি জানান। সেই দাবি গ্রামবাসীরা মেনেও নেয়। তার পর থেকে বাবুভাইরা নিজের গ্রামেই একা। সরকার সেই অর্থে পদক্ষেপ করেনি বলেই অভিযোগ। তাই বাবুভাইয়ের সিদ্ধান্ত, ‘‘এ বার ভোট দেব না। টোটালি বয়কট। কোনও রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতা-কর্মী, ভোটকর্মী কেউই আসেননি। ওদের যদি প্রয়োজন না থাকে, আমাদেরও নেই।’’ এর পর বাবুভাই মোক্ষম খোঁচাটা দিলেন, ‘‘মোদীজি প্রধানমন্ত্রী। তাঁর জন্মভূমিতেই যদি দলিতদের এই হাল হয়, তা হলে আর কী-ই বা বলার থাকে।’’
হ্যাঁ, এই মেহসানার ভডনগরেই জন্ম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। শুধু কি তাই, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ এই মেহসানাতেই পড়াশোনা করেছেন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের রাজ্যপাল আনন্দীবেন পটেল, গুজরাতের ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী নিতিনভাই পটেল তাঁদেরও জন্ম এই মেহসানায়। ১৯৮৪ সালে লোকসভায় বিজেপির খাতা খুলেছিল এই মেহসানার হাত ধরেই। এশিয়ার সবচেয়ে বড় ডেয়ারি দুধসাগরএই জেলাতে। ওএনজিসি-র সবচেয়ে বড় প্রকল্প এই মেহসানায়। বাবুভাইয়ের ভাই অম্রুতভাই সেনমার কথায়: ‘‘মেহসানা আসলে ভীষণই পাওয়ারফুল। তা সে রাজনীতি হোক বা অর্থনীতি। সেই পাওয়ারের তলায় আমরা চাপা পড়ে গিয়েছি।’’
চাপা শুধু নন্দালি পড়েনি। জেলাশহরের ঠিক গা ঘেঁষে দলিতদের বিশাল বসতি রয়েছে। ঝাঁ চকচকে সমর্পণ রোড থেকে ডান দিকে ঢুকলেই কাসবা এলাকা। পৌঁছে বোঝা গেল, এখানে কতটা সফলমোদীর স্বচ্ছ ভারত প্রকল্প। রাস্তার উপর দিয়েই নর্দমা বয়ে যাচ্ছে। এখানে সেখানে রাখা নোংরার ঢিবি। ঘিঞ্জি গলি। গরু ঘুরে বেড়াচ্ছে। গন্ধে নাক পাতা দায়। মহল্লার বেশ কিছু বাড়িতে শৌচাগার নেই। কেউ কেউ পাশের বাড়িরটা ব্যবহার করেন। কেউ বা...
কাসবার বাসিন্দা অশোক পরমার বলছিলেন, ‘‘বার বার বলেও কোনও লাভ হয়নি। এই সব পরিষ্কার করার দায়িত্ব প্রশাসনের। আমাদের মানে দলিতদের দেখলেই তারা কার্যত দূরছাই করে। তবে ভোট বলে এখন একটু কাজ হচ্ছে। যেটুকু পরিষ্কার দেখছেন, সেটা ওই ভোটের কল্যাণেই।’’ এটা পরিষ্কারের নমুনা?
কেন দলিতদের এমন অবস্থা? মেহসানা থেকেই মোবাইলে প্রশ্নটা করা গেল বিজেপি নেতা কিসান সিন সোলাঙ্কিকে। তিনি তখন আমদাবাদে প্রচারকাজে ব্যস্ত। প্রশ্ন শুনে অবাক গলায় জবাব দিলেন, ‘‘না, না আপনি যেমনটা বলছেন তেমনটা নয়। দুএকটা জায়গায় সামান্য সমস্যা হয়তো আছে। তবে ও সব মিটে যাবে। চিন্তা করবেন না।’’ তার পরেই কটাক্ষ করে বললেন, ‘‘দলিতদের অবস্থা যদি এ রাজ্যে খারাপ হবে, তা হলে কি জিগনেস মেবানী নিশ্চিন্তে বিহারের বেগুসরাইতে কানহাইয়াকুমারকে জেতানোর জন্য পড়ে থাকতেন! এতেই তো বোঝা যায়, গুজরাতে দলিতরা ভাল আছে।’’
তবে কি দলিতদের মধ্যে জিগনেসের গ্রহণযোগ্যতা কমে গিয়েছে? তাই নিজের রাজ্যে ছেড়ে ভিন্‌রাজ্যে ভোটের কাজে? বিষয়টা মানলেন না জিগনেসের সহকর্মী কৌশিক পরমার। মেহসানা পুরনো আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘‘জিগনেসের নেতৃত্বে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজে দলিত। জিগনেসের প্রভাব নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এখনও তিনি সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য।’’
মেহসানার ভোট যদিও এই দলিতদের নিয়ে মোটেও ভাবিত নয়। কথাটা বললেন  মেহসানারই বদলপুরা গ্রামের বাসিন্দা মফতলাল পটেল। তাঁর কথায়, ‘‘গোটা জেলাটাই কার্যত পাটিদার প্রভাবিত। তাদেরই রাজ চলে এখানে।’’ সেই পাটিদাররা কি এখনও হার্দিক পটেলের সঙ্গে আছে? নাকি বিজেপির পটেল-ভোট ফের ফিরে আসবে তাদের কাছে? বছর দুয়েক আগে হার্দিক পটেলের নেতৃত্বে পাটিদার আন্দোলন বিপুল ভাবে শুরু হয়েছিল তো এই মেহসানা থেকেই। এখানকার বিশনগরে বিজেপি বিধায়ক রিশুভাই পটেলের কার্যালয়ে হামলা চালানোর অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হার্দিক ওই কারণে কংগ্রেসে যোগ দিয়েও ভোটে দাঁড়াতে পারলেন না। বৃদ্ধ মফতলাল একটু হাসলেন। তার পর বললেন, ‘‘এ বার এখানে দুই পাটিদারের লড়াই। এ জে পটেল আর সারদা বেন পটেল। এর মাঝে আর কোনও পটেল নেই।’’
কংগ্রেস এ জে পটেলকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সারদা বেনও দৌড়চ্ছেন মোদী-অমিতের ছবি নিয়ে। ভোট চাইছেন। কিন্তু বাবুভাইদের কাছে যাওয়ার কেউ নেই। বাবুভাইরা টোটালি বয়কট’...
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, উজ্জ্বল চক্রবর্তী, ১৩ এপ্রিল, ২০১৯।

Friday, April 5, 2019

উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের চা-বাগানে নুন আনতে কাজ ফুরোয় অনাহারের শ্রমিক মহল্লায়।

মোটেও ভালো নেই দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। দুটাকা কিলো চালে রোজ খাবার জোটে বটে, তবে দারিদ্র্য দূর হয় না। কালচিনির আটিয়াবাড়ি চা-বাগানের শ্রমিক অমরজিত বাসফোরের কথায়, ‘শুধু সস্তার চাল খেয়ে কি জীবন চলে? কাজই তো নেই আমাদের। চা-বাগানে শ্রমিকের সংখ্যা যা ছিল, তাই আছে। কিন্তু গত ২০ বছরে আমাদের মতো শ্রমিক পরিবারে প্রজন্ম তো অনেক বেড়েছে। তাঁদের কাজ কোথায়? কেউ জবাব দিতে পারে না।
শ্রমিক লাইনের আর এক বাসিন্দা সীতা রাই বললেন, ‘সমস্যা তো আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে। সরকার ওদের বিনে পয়সায় লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সাইকেল দিয়েছে। কিন্তু লেখাপড়া শিখে ওরা তো চাকরি পাচ্ছে না। ওরা তো এখন আর পাঁচ জনের মতো ভিনরাজ্যে গিয়ে শ্রমিকের কাজও করতে পারবে না।
কালচিনির রায়মাটাং হোক অথবা কুমারগ্রামের নিউ ল্যান্ডস চা বাগান, ভোটের কথা বলতে গেলেই কাজ চান বাসিন্দারা। আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রে এমন চা-বাগানের সংখ্যা ৮১টি। যাতে স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা দুই লক্ষের বেশি। এর বাইরেও প্রচুর অ-শ্রমিক রয়েছে চা-বাগানগুলিতে।
আলিপুরদুয়ার লোকসভা নির্বাচনে এঁরা অন্যতম নীতি নির্ধারক। বাম আমলে তাদের দুর্জয় গড় ছিল চা-বাগান। তৃণমূল জমানায় চা-বাগানে ট্রেড ইউনিয়নটাই প্রায় বিলুপ্ত। এখন লাল ঝান্ডা হাতে আন্দোলনের বদলে কেউ মাথা ঠোকেন চা-বাগানের ভেতরে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা হনুমান মন্দিরে। আবার কোনও কোনও পরিবারের লেখাপড়া জানা আদিবাসী তরুণী সন্ধ্যায় সেজেগুজে জাতীয় সড়কের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। একটু ভালো থাকার আকাঙ্খা, ভালো প্রসাধন সামগ্রী কেনার খরচ জোগাড় করতে ওঁরা নাম লিখিয়েছেন সেক্স ট্রেড’-এ।
পাহাড়-জঙ্গলের মাঝে সবুজ দেখতে যত সুন্দরই হোক না কেন, আদতে শ্রমিক মহল্লাগুলি যেন এক-একটি ধূসর পৃথিবী। চা-বাগান পঞ্চায়েতের আওতায় আসার পর থেকে শ্রমিক মহল্লার রাস্তা ঢালাই হয়েছে। কিন্তু বড়ই জীর্ণ শ্রমিক আবাসগুলি। বেশিরভাগ চা-বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দিকে ফিরেও তাকান না। চিকিৎসার কোনও পরিকাঠামো নেই। সব চা-বাগানে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎও নেই। পানীয় জলের হাহাকার রয়েছে বহু চা-বাগানে।
সংখ্যায় কম হলেও ভোটের মুখে উদ্বেগ বাসা বেঁধেছে বনবস্তির ঘরে ঘরে। ভোটের লাইনে দাঁড়ানোর উৎসাহ ম্লান হয়ে যাচ্ছে ভিটে-মাটি থেকে উৎখাত হওয়ার আশঙ্কায়। আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রের আওতায় রয়েছেন ৫৫টি বনবস্তির প্রায় ৫৪ হাজার ভোটার। আপাতত স্থগিতাদেশ দিলেও গোটা ভারতেই জঙ্গল এলাকায় বসবাসকারীদের উৎখাতের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পাম্পু বস্তির বাসিন্দা সরস্বতী লোহার বলেন, ‘আমরা যাব কোথায়? আমাদের জন্ম-কর্ম-জীবিকা সবই তো এখানে। কোথায় নিয়ে ফেলবে আমাদের?’ রাষ্ট্রীয় বনজীবী শ্রমজীবী মঞ্চের আহ্বায়ক লাল সিং ভুজেল বলেন, ‘আমাদের নিয়ে অনেক তামাশা হয়েছে। দরকারে গুলি খেয়ে মরব। কিন্তু জমি দেব না।
পেট ভুখা নেই কারও। কিন্তু জীবিকা, অস্তিত্ব ইত্যাদি এ বারের বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই লোকসভা কেন্দ্রে। এর সমাধানে স্পষ্ট কোনও জবাব নেই রাজনৈতিক দল অথবা নেতাদের কাছে। ভোট বাজারে সবাই আশ্বাসের ঝুলি নিয়ে হাজির। তবে ওই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে কতটা চিঁড়ে ভিজবে, সেটাই এখন দেখার।
সৌজন্য – এই সময়, পিনাকী চক্রবর্তী, ০৫/০৪/২০১৯।  

Saturday, January 5, 2019

পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় রাতে টিউশন থেকে ফেরার পথে মাধ্যমিক পড়ুয়াকে গণধর্ষণের অভিযোগ।

পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় রাতে টিউশন থেকে ফেরার পথে মাধ্যমিক পড়ুয়াকে গণধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেফতার দুই। ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবী জানিয়েছে ভারত দিশম মাঝি মাডোয়া।

পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার ০২ রা জানুয়ারি, ২০১৯ এর রাতে। গ্রাম লাগোয়া প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তায় কোনও আলো নেই। সন্ধের পরেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত সাড়ে নটা নাগাদ টিউশন থেকে ফেরার সময় সেই আঁধার পথেই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই গ্রামের দুই যুবক। দুজনেই বিবাহিত এবং মেয়ের বাবা।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে গত বৃহস্পতিবার ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৯ রাতে বছর সাতাশের কাঞ্চন মুর্মু ও গুরুচরণ হেমব্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে নির্যাতিতা ওই কিশোরী। তার মেডিক্যাল পরীক্ষাও হয়েছে। তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত দুই অভিযুক্তের কেউ ধরা পড়েনি।
অন্ধকার ওই মোরাম রাস্তা নিয়ে ডেবরার এই গ্রামের বাসিন্দাদের ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। বিপদ এড়াতে কিশোরী-যুবতীরা ওই পথে দল বেঁধে পড়তে যায়। বুধবার রাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ওই ছাত্রীও টিউশন শেষে দুই বন্ধুর সঙ্গে ফিরছিল। তবে বাড়ির কাছের ৫০ মিটার রাস্তা একাই ফিরছিল মেয়েটি। সেখানেও কোনও পথবাতি নেই। কিশোরীর অভিযোগ, সাইকেলে যাওয়ার সময় তার পথ আটকায় কাঞ্চন ও গুরুচরণ। তারপর মুখ চেপে ছুরি দেখিয়ে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নিয়ে যায়। সেখানেই ওই দুই যুবক তাকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।
এ দিকে, রাত হয়ে গেলেও মেয়ে বাড়ি না ফেরায় খোঁজ শুরু করে ছাত্রীর পরিবার। কিশোরীর বাবা বাইক নিয়ে বেরোন। বাইকের আলোতেই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। ওই ছাত্রীর মা বলেন, “মাধ্যমিকের কটা দিন বাকি। মেয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ওই দুই যুবকের কঠোর শাস্তি চাই আমরা।
স্থানীয় সূত্রে খবর, গুরুচরণ এবং কাঞ্চন দুজনেই আগে ভিন রাজ্যে সোনার কাজ করত। তবে বছর দুয়েক হল গ্রামে ফিরে চাষবাস করছে। গুরুচরণের দুই শিশুকন্যা আর কাঞ্চনের বছর দুয়েকের এক মেয়ে রয়েছে। গ্রামে এমন কাণ্ড ঘটে যাওয়ায় সকলেই হতবাক। আর মহিলারা আতঙ্কিত। স্থানীয় বাসিন্দা সানোয়ারা বিবি বলেন, “পঞ্চায়েত থেকে পথবাতি বসায়নি। সন্ধের পরে ওই রাস্তা অন্ধকারে ডুবে থাকে। চলতে ভয় করে।ওই ছাত্রীর স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরও বক্তব্য, “ওই পথে বহু পড়ুয়া যাতায়াত করে। আলো লাগানো সত্যি জরুরি।
সমস্যা মানছেন ওই গ্রামেরই বাসিন্দা তথা পঞ্চায়েত প্রধান মহম্মদ জুলফিকর। তিনি বলেন, “গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও পথবাতি এখনও বসাতে পারিনি। তবে রাস্তা পিচের হচ্ছে। পরে পথবাতিও বসানো হবে।
শুক্রবার গভীর রাতে পালানোর সময়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেল গণধর্ষণে অভিযুক্ত দুই যুবক। শুক্রবার গভীর রাতে ডেবরার গোলগ্রাম থেকে ওই দুই যুবককে গ্রেফতার করে ডেবরা থানার পুলিশ। ধৃত বছর সাতাশের গুরুচরণ হেমব্রম ও কাঞ্চন মুর্মুর বাড়ি ডেবরাতেই। তাদের বিরুদ্ধে ‘প্রোটেকশন অফ চাইল্ড ফ্রম সেক্সুয়াল অফেনসেস’ বা পকসো আইনে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে।
শনিবার ধৃতদের মেদিনীপুরে জেলা পকসো আদালতে হাজির করানো হয়। যদিও এ দিন বিচারক না থাকায় তাদের ফের সোমবার আদালতে তোলা হবে। তার আগে পর্যন্ত ধৃতদের জেল হেফাজতে রাখা হবে। বর্তমানে মেদিনীপুর মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ওই কিশোরী। এখনও থমথমে গ্রামের পরিস্থিতি।
ঘটনার পর থেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় ওই দুই যুবক। গোলগ্রাম থেকে ওই দুই যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই যুবকেরা কোনওভাবে বালিচক গিয়ে ট্রেন ধরার পরিকল্পনা করছিল বলে পুলিশের দাবি। অবশ্য ওই দুই যুবক ধরা পড়লেও তাদের মোবাইল পাওয়া যায়নি।
ওই নির্যাতিতা কিশোরীর বাবা বলেন, “অভিযুক্তদের দুজন গ্রেফতার হওয়ায় খুশি। তবে আমরা চাই ওই দুজনের কঠোর শাস্তি। মেয়ের যে সর্বনাশ ওরা করেছে তার ক্ষমা নেই। মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে বলছে। তাই আপাতত মেয়েকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া এখন মূল লক্ষ্য।”
সমস্ত ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে আদিবাসী সামাজিক সংগঠন “ভারত দিশম মাঝি মাডোয়া”। সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রদীপ হাঁসদা ও দিশম গোডেৎ সলিল মান্ডি মহাশয় ঘটনার তীব্র নিন্দা করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবী জানিয়েছেন পুলিশ প্রশাসনের কাছে।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ ও ৬ ই জানুয়ারি, ২০১৯।

অভিনন্দন চুনিবালা হাঁসদা, প্রাত্তন বিধায়ক ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)-র সভানেত্রী।

রাজনীতির ময়দান সামলে খেলার মাঠেও সোনা জয় প্রাক্তন বিধায়ক ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন গোষ্ঠী)-র সভানেত্রী চুনীবালা হাঁসদার।

এক সময়ে বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ডাকাবুকো বিধায়ক ছিলেন ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন গোষ্ঠী)-র সভানেত্রী চুনিবালা হাঁসদা। বিনপুর বিধানসভা থেকে জিতেছেন দু’ বার, ২০০০ আর ২০০৬ সালে। সেই চুনীবালা হাঁসদা এখন সোনাজয়ী অ্যাথলিট।
পঞ্চান্ন ছোঁয়া চুনীবালা সর্বভারতীয় ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) গোষ্ঠীর সভানেত্রী। দলের কাজে ছুটে বেড়াতে হয় বাংলা, ঝাড়খণ্ড, বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তার মধ্যেই নিয়ম করে প্রতিদিন দৌড়ন, লাফান, জ্যাভলিন ছোড়েন। ছোটবেলায় অ্যাথলিট হওয়ার ইচ্ছে ছিল। সেই ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে প্রবীণদের টুর্নামেন্টে।
এক বছর আগেই বাংলাদেশে এশীয় স্তরের পদক জিতে এসেছেন। দিল্লিতে জাতীয় স্তরে তিনটি সোনা জিতেছেন হাইজাম্প, লং জাম্প এবং জ্যাভলিন থ্রো-তে। কয়েক দিন আগে ইছাপুরে রাজ্য মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্সে অনূর্ধ্ব ৫৫ বিভাগে নেমে তিনটি সোনা (শটপাট, লং জাম্প ও ট্রিপল জাম্প) জিতে ফের চমকে দিয়েছেন। জেতার পর  সাঁওতালি ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে মাতিয়ে দিয়েছেন প্রতিযোগিতা।
বিনপুর থেকে ফোনে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদক রতন চক্রবর্তীকে বললেন, ‘‘আমার ঘরে এত পদক আছে যে, গুনে শেষ করতে পারবেন না। কিন্তু ইটালিতে মাস্টার্স অলিম্পিক্সে অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া হওয়াটা এখনও যন্ত্রণা দেয়। একটা আন্তর্জাতিক পদক পাওয়াই এখন লক্ষ্য আমার।”
চুনীবালা হাঁসদার কথাগুলো শুনে মনে হয়, কোনও মিলখা সিংহ, পি টি ঊষা, জয়দীপ কর্মকার বা দীপা কর্মকার কথা বলছেন। অলিম্পিক্সে অল্পের জন্য চতুর্থ হয়েছিলেন ওই চার জনই। আর ইটালিতে মাস্টার্স অলিম্পিক্সের পোলভল্ট ইভেন্টে ২৭টি দেশের প্রতিযোগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অল্পের জন্য ব্রোঞ্জ জিততে পারেননি চুনীবালাও।
সপ্তাহে দুদিন নিয়ম করে ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামে যান অনুশীলনে। ‘‘প্রতিদিন সকালে অন্তত দশ কিলোমিটার দৌড়ই। রাস্তার পাশে, বনের ভিতর দিয়ে। দুদিন স্টেডিয়ামে যেতে হয় জ্যাভলিন থ্রো আর হাই জাম্প, লং জাম্প অনুশীলন করতে। ওগুলো তো রাস্তায় করা যায় না” চুনীবালার গলায় অদ্ভুত তৃপ্তি। গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘‘জানেন, হাইজাম্পে রেকর্ড আছে আমার। পাঁচ ফুট দুইঞ্চি লাফিয়েছিলাম।”
স্বামী জনপ্রিয় ঝাড়খণ্ডী নেতা নরেন হাঁসদার নামেই তাঁর দল। নরেন হাঁসদাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)। নব্বই এর দশকে জঙ্গল মহলের তিন জেলা মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)। জঙ্গল মহলে তৎকালীন রাজ্যের শাসক দল সিপিএমের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)। নরেন হাঁসদা নিজেও দুই বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে।
চুনিবাল দেবীও স্বামীর বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই জিতেছেন দুবার। ২০১১-তে হেরে যান সিপিএমের কাছে। বিধায়ক থাকার সময়েই গিয়েছিলেন ইটালিতে। ২০০৭-এ। সে বার পদক আসেনি। এখন আবার পদকের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ‘‘তখন যে বিভাগে নেমেছিলাম, এখন নামতে হবে অন্য বিভাগে। কিন্তু যে ভাবে অনুশীলন করছি, আশা রাখছি পদক পাব।”
বিধায়ক হওয়ার পরেও লক্ষ্মীরতন শুক্ল ক্লাব ক্রিকেটে খেলেছেন। বিধায়ক দীপেন্দু বিশ্বাসও খেলেছেন মহমেডানে। ভাইচুং ভুটিয়া, রহিম নবিরা ভোটে দাঁড়ানোর পরেও মাঠে নেমেছেন। কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়ে বাংলার কোনও বিধায়ক আন্তর্জাতিক স্তরে তো বটেই, জাতীয় স্তরেও খেলেননি। চুনীবালা সে দিক থেকে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
ফের বিধায়ক পদ, না আন্তর্জাতিক পদক কোনটা অগ্রাধিকার এখন? চুনীবালা চমকে দিয়ে জবাব দেন, ‘‘বিধায়ক তো করবে জনগণ। ওখানে আমার কোনও হাত নেই। কিন্তু পদক জয় নির্ভর করবে আমার চেষ্টা ও পরিশ্রমের উপর।”
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, রতন চক্রবর্তী, ৬ জানুয়ারি, ২০১৯।

Friday, January 4, 2019

মারাং গোমকে জয়পাল সিং মুন্ডার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।



লিখেছেন – প্রদীপ কুমার হাঁসদা, কেন্দ্রীয় সভাপতি, ভারত দিশম মাঝি মাডোয়া।

০৩ রা জানুয়ারি আদিবাসী সমাজের গর্ব ‘মারাং গোমকে’ জয়পাল সিং মুন্ডার জন্মদিন। আজকের দিনে ১৯০৩ সালে বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের খুঁটি জেলার টাকরা গ্রামে এক মুন্ডা পরিবারে জন্মগ্রহন করেন জয়পাল সিং মুন্ডা।
স্থানীয় স্কুলে পড়ার সময় খৃষ্টান মিশনারিরা জয়পাল সিং মুন্ডার মেধা লক্ষ্য করেন এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। ইংল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেন্ট জন’স কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক পাস করেন। সেন্ট জন’স কলেজে থাকাকালীন প্রথম ভারতীয় হিসেবে জুনিয়র কমনরুমের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথম আদিবাসী হিসেবে অক্সফোর্ড ভারতীয় মজলিশ (Oxford Indian Majlis) এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনপ্রিয় ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তৎকালীন সময়ে সি এফ এন্ড্রুজ, অ্যানি বেসেন্ট, লালা লাজপত রায় দের মতন বিখ্যাত ভারতীয়দের সংস্পর্শে আসেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়পাল সিং মুন্ডার সমসাময়িক ছিলেন স্বতন্ত্র পার্টির নেতা এন জি রাঙ্গা ও অনান্য বিশিষ্ট ভারতীয়রা।
১৯২৭ সালে তৎকালীন ভারতের সর্বোচ্চ সরকারী চাকরি ICS (Indian Civil Service) এ সসন্মানে উত্তীর্ণ হন ও মৌখিক এ সর্বোচ্চ নম্বর পান। জয়পাল সিং মুন্ডা আদিবাসী সমাজের মধ্যে থেকে সর্বপ্রথম ICS (Indian Civil Service) পাস কারী আদিবাসী ছিলেন। জয়পাল সিং মুন্ডার আত্মসন্মান এতই প্রবল ছিল যে আত্মসন্মানের প্রশ্নে ICS (Indian Civil Service) এর মতন লোভনীয় চাকরি থেকে তিনি হেলায় ইস্তফা দিয়েছিলেন। বর্তমান ভারতের ইতিহাস পড়ে আমরা জেনেছি যে নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু দেশের জন্য ICS (Indian Civil Service) এর মতন লোভনীয় চাকরি ছেড়েছিলেন, কিন্তু তিনিই একমাত্র ভারতীয় ছিলেন না। দেশের জন্য ICS (Indian Civil Service) এর মতন লোভনীয় চাকরি ছেড়েছিলেন জয়পাল সিং মুন্ডাও।    
জয়পাল সিং মুন্ডার হকি খেলার দক্ষতা দেখে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হকি দলের নিয়মিত সদস্য নির্বাচিত ছিলেন ও হকি দলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ভ্রমন করে হকি প্রতিযোগিতায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। হকি খেলায় দক্ষতার কারনে জয়পাল সিং মুন্ডা Oxford Blues এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।
হকি খেলায় দক্ষতার কারনে তৎকালীন সময়ের ভারতের ভাইসরয় জয়পাল সিং মুন্ডাকে অলিম্পিকে ভারতীয় হকি দলের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান। ১৯২৭ সালে তৎকালীন ভারতের সর্বোচ্চ সরকারী চাকরি ICS (Indian Civil Service) এ সসন্মানে উত্তীর্ণ হবার পর জয়পাল সিং মুন্ডাকে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ১৯২৮ সালে অলিম্পিকে ভারতীয় হকি দলের অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হবার পর, জয়পাল সিং মুন্ডা নিজের জীবনের কেরিয়ারের চেয়ে ভারতের সন্মান তুলে ধরা বেশি উচিত মনে করেন ও হকি দলের সাথে যোগ দেন, যা তার ICS (Indian Civil Service) চাকরির প্রশিক্ষণে ছেদ টেনে দেয়। অলিম্পিকে সেমিফাইনেল ম্যাচ অবধি ভারতীয় হকি দলকে সফল ভাবে নেতৃত্ব দেন, কিন্তু ICS (Indian Civil Service) এর ফাইনাল পরিক্ষার জন্য অলিম্পিকে হকির ফাইনাল ম্যাচ না খেলেই লন্ডন ফিরে আসেন। সেই বছর ভারত অলিম্পিকে প্রথম জয়ী হয়ে সোনা জেতে। লন্ডনে ফিরে অলিম্পিকের সাফল্যের জন্য জয়পাল সিং মুন্ডাকে খোদ ভারতের ভাইসরয় অভিনন্দন জানান। কিন্তু হকি খেলার জন্য ICS (Indian Civil Service) প্রশিক্ষণের যে সময়টা বাদ গিয়েছিল, তার জন্য পুনরায় জয়পাল সিং মুন্ডাকে প্রশিক্ষণ নিতে বলা হয়। জয়পাল জানান, সমস্ত পরিক্ষায় তিনি সসন্মানে পাস করেছেন, মৌখিকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন, এবং ছুটি তিনি নিয়েছিলেন দেশের হয়ে হকি খেলার জন্য, ব্যক্তিগত আমোদ প্রমোদের জন্য নয়, তাই কোন অবস্থায় তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য ICS (Indian Civil Service) প্রশিক্ষণ নেবেন না। জয়পাল সিং মুন্ডা মনে করলেন যে তিনি ভারতীয় বলেই তাঁর সঙ্গে বৈষম্য করছে ব্রিটিশ কতৃপক্ষ, তাই তিনি নিজের আত্মন্সন্মান রক্ষার্থে ICS (Indian Civil Service) চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়াই শ্রেয় মনে করে ইস্তফা দেন।
এর পর দেশবিদেশে বিভিন্ন কোম্পানি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে সন্মানিয় সব চাকরি করেন জয়পাল সিং মুন্ডা।
১৯৩৭ সাল নাগাদ ছত্তিসগড়ের রাজকুমার কলেজ, রাইপুরের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে ভারতে ফিরে আসেন। ১৯৩৮ সাল নাগাদ কলোনি মন্ত্রী ও রাজস্ব কমিশনার হিসেবে রাজস্থানের দেশীয় রাজ্য বিকানেরে যোগ দেন। পরবর্তীকালে বিকানের রাজ্যের বিদেশ সচিব পদে নির্বাচিত হন। সেই সময়ে ভারতে চলমান স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করে বিহারে ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে সাদাকাত আশ্রম, পাটনায় দেখা করেন। কিন্তু ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ জয়পাল সিং মুন্ডার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। বিহার রাজ্যের তৎকালীন গভর্নর স্যার মরিস হ্যালেট জয়পাল সিং মুন্ডাকে বিহারের বিধান পরিষদে মনোনীত করতে চাইলেও জয়পাল অস্বীকার করেন।
এই সময়ের কিছু ঘটনাবলি জয়পাল সিং মুন্ডার জীবন, ভারতীয় রাজনীতি ও আদিবাসীদের ভাগ্য পরিবর্তন করল। ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের কাছে থেকে কোনরকম সাড়া না পেয়ে জয়পাল সিং মুন্ডা রাজনীতিতে যোগ দানের বিষয়ে হতাশ হয়েই বাকি জীবনটা অধ্যাপনা করে কাটিয়ে দেবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সব হিসেব গুলিয়ে দিল ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজের (Chotonagpur Unnati Samaj) আদিবাসী ছাত্র নেতারা।
ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজের (Chotonagpur Unnati Samaj) আদিবাসী ছাত্র নেতারা ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসীদের উন্নতি সাধনের জন্য পৃথক আদিবাসী রাজ্য বা অঞ্চল গঠনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছিলেন, কিন্তু সাফল্য পাচ্ছিলেন না। আন্দোলন আরও জোরদার করতে ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজ (Chotonagpur Unnati Samaj) ও আরও অনান্য আদিবাসী সংগঠন কে মিলিয়ে নতুন সংগঠন “আদিবাসী মহাসভা” গঠনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। সেই সময় জয়পাল সিং মুন্ডা ভারতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। জয়পাল সিং মুন্ডার সাথে তাঁর সাফল্যের কাহিনীও ভারতে এসেছিল। একজন আদিবাসী হিসেবে এই অভাবনীয় সাফল্য আদিবাসী সমাজে জয়পাল সিং মুন্ডাকে কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত করেছিল। “আদিবাসী মহাসভা”-র নেতৃবৃন্দ আদিবাসী সমাজের জীবন্ত কিংবদন্তী জয়পাল সিং মুন্ডাকেই “আদিবাসী মহাসভা”-র নেতৃত্ব গ্রহণ করে আদিবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার আহ্বান জানালেন।
ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজের আদিবাসী ছাত্র নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে “আদিবাসী মহাসভা”-র নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে সম্মত হলেন জয়পাল সিং মুন্ডা। কৃতজ্ঞ আদিবাসী সমাজ জয়পাল সিং মুন্ডাকে “সর্বোচ্চ নেতা” তথা “মারাং গোমকে” উপাধিতে ভূষিত করেন। পরবর্তীকাল ১০ বছরে জয়পাল সিং মুন্ডার নেতৃত্বে “আদিবাসী মহাসভা” ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসীদের সুসংগঠিত করে জোরদার আদিবাসী আন্দোলন গড়ে তোলে। জয়পাল সিং মুন্ডার নেতৃত্বে আদিবাসী মহাসভা সাঁওতাল পরগনা ও ছোটনাগপুর অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক আদিবাসী রাজ্য গঠনের দাবি তুলল।
এর মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে ও নতুন ভারতবর্ষ পরিচালনার জন্য নতুন সংবিধান রচনার দরকার পড়ে। ভারতের সংবিধান রচনা সভায় আদিবাসীদের হয়ে সওয়াল করতে ৫ জন আদিবাসী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন – ১) জয়পাল সিং মুন্ডা (ঝাড়খণ্ড রাজ্য), ২) বনিফেস লাকড়া (ঝাড়খণ্ড রাজ্য), ৩) রাম প্রকাশ পটাই (ছত্তিসগড় রাজ্য), ৪) মাংরু উকে (মধ্যপ্রদেশ রাজ্য) ও ৫) ধরণীধর বসুমাতারি (আসাম রাজ্য)। এদের মধ্যে সবথেকে জোরদার ছিল মারাং গোমকে জয়পাল সিং মুন্ডার সওয়াল।
সংবিধান সভা রচনার প্রথম দিকে আদিবাসীদের ভাগ্য নিয়ে কারোর কোন মাথা ব্যথা ছিল না। জয়পাল সিং মুন্ডাকেও কংগ্রেস নেতৃত্ব বা অনান্য জাতীয় দলের নেতৃত্বরা গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। সংবিধান রচনা সভায় ১৭ টি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু কোনটাতেই জয়পাল সিং মুন্ডাকে বা কোন আদিবাসী প্রতিনিধিকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়নি।
আদিবাসী বিষয়ক প্রায় ৫ টি কমিটি ছিল যথাক্রমে – ১) Advisory Committee on Fundamental Rights, Minorities and Tribal and Excluded Areas, চেয়ারম্যান ছিলেন মাননীয় Vallavbai Patel, ২) Minorities Sub-committee, চেয়ারম্যান ছিলেন মাননীয় HC Mookherjee, ৩) Fundamental Rights Sub-Committee, চেয়ারম্যান ছিলেন মাননীয়া JB Kripalani, ৪) North-East Frontier Tribal Areas and Assam, Excluded and Partially Excluded Areas Sub-Committee, চেয়ারম্যান ছিলেন মাননীয় Gopinath Bardoloi, ও ৫) Excluded and Partially Excluded Area (other than those in Assam) Sub-Committee, চেয়ারম্যান ছিলেন মাননীয় AV Thakur।
কিন্তু জয়পাল সিং মুন্ডা আদিবাসী স্বার্থ রক্ষার্থে বারে বারেই জোরদার সওয়াল করে গিয়েছেন। তার প্রমাণ আমরা পায় সংবিধান রচনা সভায় বিভিন্ন বিষয়ে জয়পাল সিং মুন্ডার বক্তব্য থেকে (Debates of Jaipal Singh Munda in Constituent Assembly of India)
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহের লিখিত বই “India After Gandhi” থেকে জানা যায় যে সংখ্যালঘু অধিকার সংক্রান্ত প্রথম প্রকাশিত রিপোর্টে শুধুমাত্র দলিতদের জন্য সংরক্ষনের সুবিধের সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই রিপোর্টে মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণের সুবিধে খারিজ করা হয়েছিল, আর আদিবাসীদের বিষয়ে কোন উচ্চ বাচ্যই করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে জয়পাল সিং মুন্ডা জোরদার বিরোধিতা করেন ও আদিবাসীদের জন্যেও সংরক্ষণের সুবিধে দাবি করেন। জয়পাল সিং মুন্ডার বিরোধিতার কারনে AV Thakur এর নেতৃত্বে একটি সাব-কমিটি আদিবাসীদের বিষয়টি খতিয়ে দেখে এবং পরবর্তীকালে আদিবাসীদের জন্যেও Scheduled Caste এর মতন সংরক্ষণের সুবিধের সুপারিশ করে।
সংবিধান সভায় জয়পাল সিং মুন্ডা আদিবাসীদের আত্মপরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে জোরদার সওয়াল করেছিলেন। জয়পাল সিং মুন্ডা চেয়েছিলেন ভারতীয় সংবিধানে আদিবাসীদের পরিচিতি হোক “আদিবাসী” হিসেবেই, কিন্তু অধিকাংশ সদস্যের আপত্তিতে আদিবাসীদের ভারতীয় সংবিধান অভিহিত করা হল Scheduled Tribe বা তপশিলী জনজাতি বা তপশিলী উপজাতি হিসেবে।
সংবিধান সভায় আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষার্থে জয়পাল সিং মুন্ডা অনেকগুলি দাবি তুলেছিলেন, কিন্তু প্রায় সবগুলিই খারিজ হয়। তাই প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে জয়পাল সিং মুন্ডা “আদিবাসী মহাসভা”-কে পুরোপুরি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত করতে মনস্থির করলেন। জয়পাল সিং মুন্ডা বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজনৈতিক ভাবে আদিবাসীদের সুসংগঠিত করতে না পারলে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। ১৯৪৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর ও ১৯৫০ সালে ১ লা জানুয়ারি “আদিবাসী মহাসভা”-র অধিবেশনে সংগঠনের নতুন নামকরন হল “ঝাড়খণ্ড পার্টি” রুপে। (একটি সুত্র থেকে জানা যায় যে ৫ ই মার্চ, ১৯৪৯ এ ঝাড়খণ্ড পার্টি গঠিত হয়েছিল)। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জয়পাল সিং মুন্ডার নেতৃত্বে ঝাড়খণ্ড পার্টি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্য “ঝাড়খণ্ড রাজ্য” গঠনের জন্য “অলগ প্রান্ত” এর ডাক দিয়ে ব্যাপক নির্বাচনী সাফল্য লাভ করে। লোকসভায় ৩ টি আসন ও বিহার বিধানসভায় ৩২ টি আসন জয়লাভ করে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দেয় ঝাড়খণ্ড পার্টি। বিহার বিধানসভায় প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পায় ঝাড়খণ্ড পার্টি।  
প্রথম দিকে নির্বাচনী সাফল্য লাভ করলেও আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি আদায় করতে না পারায় ঝাড়খণ্ড পার্টির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে ও নির্বাচনে ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হয়। হতাশ জয়পাল সিং মুন্ডা ১৯৬৩ সালে ঝাড়খণ্ড পার্টিকে কংগ্রেস দলের সাথে মিলিয়ে দিলে আদিবাসী জনতা জয়পাল সিং মুন্ডার ওপর বিরুপ হয় ও জনপ্রিয়তা হাস্র পায়। ১৯৭০ সালের ২০ শে মার্চ ভগ্ন হৃদয়ে প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে আদিবাসীদের কিংবদন্তী নায়ক মারা যান।
তৎকালীন সময়ের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঐতিহাসিকরা জয়পাল সিং মুন্ডার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি, আজও সঠিক ভাবে মুল্যায়ন হচ্ছে না। কিন্তু বর্তমানের এই ডিজিটাল যুগে সত্য কে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আজ যখন জয়পাল সিং মুন্ডা সম্পর্কিত দলিল গুলি একে একে বেরিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষ জানতে পারছে, তখন বোঝা যাচ্ছে যে জয়পাল সিং মুন্ডা কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ইতিহাস শুধু নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের কথা আমাদের জানিয়েছে, যিনি দেশের সেবার জন্য তৎকালীন সময়ের ICS (Indian Civil Service) এর মতন লোভনীয় চাকরি থেকে হেলায় ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস জয়পাল সিং মুন্ডার কথা লেখেনি। জয়পাল সিং মুন্ডাও দেশের সেবার জন্য তৎকালীন সময়ের ICS (Indian Civil Service) এর মতন লোভনীয় চাকরি থেকে হেলায় ইস্তফা দিয়েছিলেন। আজ সত্যের আলোকে সকলের জানা উচিত যে ভারতীয় সংবিধান রচনা সভায় আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য জয়পাল সিং মুন্ডার মতন কিংবদন্তী উপস্থিত ছিলেন। আদিবাসীদের সংরক্ষণের সুযোগ সুবিধে প্রদানের ক্ষেত্রে জয়পাল সিং মুন্ডার অবদান কারোর পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আজ যখন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন “আদিবাসী” শব্দটিকে নিজেদের পরিচিতি হিসেবে সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্দোলন চালাচ্ছেন, তখন আমরা জানতে পারছি যে ১৯৪৭ সালেই ভারতীয় সংবিধান রচনার সময় জয়পাল সিং মুন্ডা এই দাবি জোরদার ভাবে উত্থাপন করেছিলেন। আজ যখন সারা দেশ জুড়ে ভারতীয় সংবিধানের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তপশীল নিয়ে নিজেদের অধিকার প্রচেষ্টার জন্য আন্দোলন চালাছেন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, তখন সংবিধান রচনা সভায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ তপশীল নিয়ে জয়পাল সিং মুন্ডার সওয়াল আদিবাসীদের অনুপ্রেরণা জাগায়। জয়পাল সিং মুন্ডা আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্য “ঝাড়খণ্ড রাজ্য” গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০০০ সালে “খণ্ডিত ঝাড়খণ্ড রাজ্য” গঠিত হয়ে জয়পাল সিং মুন্ডার স্বপ্নকে ব্যঙ্গ করেছে।
আদিবাসী কিংবদন্তী মারাং গোমকে জয়পাল সিং মুন্ডা আজও যথাযথ সন্মান পাননি। “ভারত রত্ন” সন্মান পাবার যোগ্য দাবিদার ছিলেন জয়পাল সিং মুন্ডা। কিন্তু ভারত সরকার জয়পাল সিং মুন্ডাকে এই সন্মান দেবার প্রয়োজন বোধ করেননি ও আদিবাসী সংগঠনগুলিও এই দাবি জোরদার ভাবে তুলতে পারেনি। কেন্দ্রীয় সরকার ও মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার যেভাবে বাবা সাহেব আম্বেদকরের চিন্তা ধারা, জীবনী, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বাবা সাহেব আম্বেদকরের লেখা, রচনাবলী প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সময়ে, সেটা জয়পাল সিং মুন্ডার ক্ষেত্রে হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার ও বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্য সরকার জয়পাল সিং মুন্ডার বিভিন্ন লেখা, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা, রচনাবলী, জীবনী প্রকাশ করার কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত জানা নেই। কেন্দ্রীয় সরকার বাবা সাহেব আম্বেদকরের চিন্তা ধারা ছড়িয়ে দিতে Ambedkar Foundation (http://ambedkarfoundation.nic.in/html/index.html) গঠন করেছে, কিন্তু জয়পাল সিং মুন্ডার ক্ষেত্রে সেইরকম কোন উদ্যোগ নেই। নিদেনপক্ষে জয়পাল সিং মুন্ডার নামাঙ্কিত ডাক টিকিট ভারত সরকার প্রকাশ করে সন্মান প্রদর্শন করতে পারত, কিন্তু তাও করেনি।  বর্তমান প্রজন্মকে জয়পাল সিং মুন্ডার মতন কিংবদন্তীকে পরিচিত করাতে জয়পাল সিং মুন্ডার জীবনী, সংগ্রাম, ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের কথা, ভারতীয় সংবিধান রচনা সভায় জয়পাল সিং মুন্ডার বক্তব্য, বিস্তারিত ভাবে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার, কিন্তু সেইরকম কোন উদ্যোগ নেই। জয়পাল সিং মুন্ডার জীবনী, সংগ্রাম, ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের কথা, ভারতীয় সংবিধান রচনা সভায় জয়পাল সিং মুন্ডার বক্তব্য নিয়ে তরুন গবেষকদের উৎসাহ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (University Grants Commission - UGC) এর পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তবেই হয়ত আগামি দিনে আদিবাসী কিংবদন্তী মারাং গোমকে জয়পাল সিং মুন্ডার যথাযথ সন্মান ও মুল্যায়ন সম্ভব হবে।