Wednesday, July 24, 2019

জলাভাবে পেশা পরিবর্তন আদিম আদিবাসী শবর জনগোষ্ঠীর।


ঝাড়গ্রামে জলাভাবে পেশা পরিবর্তন করে চাষি থেকে দিনমজুর হতে বাধ্য হলেন আদিম আদিবাসী শবর জনগোষ্ঠী।

ঝাড়গ্রাম শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রান্তিক এলাকা চাঁদাবিলায় বাস করে ১২০ টি শবর পরিবার। এলাকায় ৬০ টি শবর পরিবারের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ২০ একর। শবরদের চাষাবাদে আগ্রহী করে তুলতে বাম আমলে ২০০৮-২০০৯ সালে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের উদ্যোগে বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচের বন্দোবস্ত করা হয়। এলাকায় সরকারি জমি না মেলায় পাম্প হাউস তৈরির জন্য জমি দান করেন শবর সম্প্রদায়ের স্থানীয় বাসিন্দা কুনু মল্লিক। প্রকল্প চালু হওয়ার পরে পাম্প হাউস থেকে সরাসরি জল পড়ত জমিতে। শবরদের অভিযোগ, প্রকল্পে পাইপ লাইনের মাধ্যমে জমিতে-জমিতে জল দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সে সব কিছুই হয়নি। তবে সেচের জল কাঁচা নালা দিয়ে জমিতে পড়ায় চাষাবাদ শুরু করেন শবররা। মরসুমে ধান, আলু, সর্ষে ও তৈলবীজ চাষও করতেন শবররা।
পাম্প হাউসের জমিদাতা প্রয়াত কুনু মল্লিকের ছেলে পঞ্চানন মল্লিক বলেন, ‘‘আমাকে সেচ পাম্পটি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিল মেটানোর কথা ছিল ঝাড়গ্রাম পুরসভার। কিন্তু ঝাড়গ্রাম পুরসভা বিল না মেটানোয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পাম্প হাউসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ বন্টন সংস্থা।’’
স্থানীয় বাসিন্দা মেথরা মল্লিক, নির্মল মল্লিক, চিত্ত মল্লিক, খোকন মল্লিকদের অভিযোগ, আচমকা পাম্প হাউস যে বার বন্ধ করে দেওয়া হয়, ওই বছর তাঁরা আলু চাষ করেছিলেন। জলের অভাবে পুরো চাষ নষ্ট হয়ে যায়। পঞ্চানন মল্লিকের কথায়, ‘‘পাম্প হাউসের বিলের প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ দফতর।’’
বিল মেটাতে পারেনি ঝাড়গ্রাম পুরসভা। তাই সেচ পাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বন্টন সংস্থা। আর তার জেরে পেশাই বদলে গিয়েছে বেশ কয়েকটি শবর পরিবারের। চাষি থেকে তাঁরা হয়ে গিয়েছেন দিনমজুর।
সেচের জলের অভাবে প্রায় সাড়ে তিন বছর চাষাবাদ বন্ধ থাকাতেই এই পেশা-বদল। ঝাড়গ্রাম শহরের বুকে শবরদের এই দুর্গতি পুরসভারও অজানা নয়। তবে মেটেনি। বামেদের তরফে পুর-কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দিয়ে অবিলম্বে সেচ পাম্প সচলের দাবি জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও চিঠি দেন তাঁরা। কিন্তু সুরাহা হয়নি।
দরিদ্র শবররা জানাচ্ছেন, চাষ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের বেশির ভাগই এখন ঝাড়গ্রামে দিনমজুরের কাজ করেন। আরও অভিযোগ, বাম আমলের প্রকল্প হলেও পাম্প হাউসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় বর্তমান সরকারের আমলে। খোকন মল্লিক, চিত্ত মল্লিকরা বলেন, ‘‘নিজেদের উদ্যোগে শ্যালো টিউবওয়েল বসিয়ে সেচের ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই আমাদের।’’
বিদ্যুৎ বন্টন সংস্থার এক আধিকারিক জানান, বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। এখন উপায়? ঝাড়গ্রাম পুরসভার প্রশাসক সুবর্ণ রায় অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘পুর-প্রশাসনের এক প্রতিনিধি দল পাম্প হাউস পরিদর্শন করে এসেছেন। সমস্যা মেটাতে পদক্ষেপ করা হচ্ছে।’’
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩/০৭/২০১৯।

Tuesday, July 23, 2019

কাটমানির টাকা ফেরতের থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মানুষেরা।

কাটমানির টাকা ফেরতের দাবিতে শাসকদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন ক্যানিং এর আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মানুষেরা।

কাটমানি ফেরতের দাবিতে এ বার থানার দ্বারস্থ হলেন বেশ কিছু আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মানুষেরা। অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূলের দুই নেতা লীলা সর্দার ও রেজাউল শেখ গ্রামবাসীদের কাছ থেকে নানা প্রকল্পে কাটমানি খেয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে দুই নেতার বিরুদ্ধে ক্যানিং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ক্যানিংয়ের গোপালপুর পঞ্চায়েতের বেশ কিছু আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মানুষেরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার গ্রামের মানুষ কাটমানি ফেরতের দাবিতে পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সদস্য লীলা সর্দারের বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। প্রায় শখানেক গ্রামবাসী ঘণ্টা দুয়েক ঘেরাও করে রাখেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সরিয়ে দেয়। কোনও অভিযোগ থাকলে পুলিশের তরফ থেকে তা থানায় গিয়ে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
সেই মতোই মঙ্গলবার প্রায় কুড়িটি আদিবাসী ও সংখ্যালঘু পরিবার ক্যানিং থানায় অভিযোগ দায়ের করে। স্থানীয় পাটাভাঙি বুথের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য লীলা ও পাশের গোপালপুর বুথের পঞ্চায়েত সদস্যের স্বামী রেজাউল শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁদের। অভিযোগকারী শেফালি সর্দার, সমতুল দাস, শম্ভুনাথ মণ্ডলদের অভিযোগ, “সরকারি প্রকল্পের ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে এক একজনের কাছ থেকে দশ থেকে চোদ্দো হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরেও সকলে ঘর পাননি। কেউ ঘর তৈরির প্রথম কিস্তির টাকা পেলেও পরবর্তী কিস্তির টাকা পাননি।’’ অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল বলেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বদনাম করার চেষ্টা করছেন কিছু মানুষ।’’ লীলাকে অবশ্য এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি বলে জানা যায়।
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ জুলাই, ২০১৯। 

কয়লাখনি তৈরির জন্য জঙ্গল কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলেন আদিবাসীরা।


বীরভূম জেলায় কয়লাখনি তৈরির জন্য জঙ্গল কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলেন আদিবাসীরা।

বীরভূম জেলার খয়রাশোল ব্লকের গঙ্গারামচক মৌজায় পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম খোলামুখ কয়লাখনি তৈরির জন্য সম্প্রতি ১০১ হেক্টর বনভূমি সাফাইয়ের কাজে হাত দিয়েছে। কিন্তু এলাকার আদিবাসীরা জঙ্গল ধ্বংস করার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার হয়েছেন। প্রথমে প্রতিবাদে বিডিও-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন বনভূমি সংলগ্ন এলাকার  কয়েকটি আদিবাসী গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, এতে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ নষ্ট হচ্ছে, তাতে আঁচ পড়তে পারে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়। প্রস্তাবিত খনিএলাকা সংলগ্ন বাস্তবপুর, সগড়ভাঙ্গা, বেলডাঙা, ভাদুলিয়া গঙ্গারামচক, দেবগঞ্জ এলাকার আদিবাসীরা গত মঙ্গলবার (১৬/০৭/২০১৯) বিডিও-র কাছে লিখিত ভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর বক্তব্য, এখনই হয়তো তাঁদের বসতে হাত পড়বে না, কিন্তু যে ভাবে জঙ্গল কেটে কয়লাখনি তৈরির কাজ চলছে, তাতে ঘুরিয়ে তাঁদের উচ্ছেদের পরিকল্পনাই করা হয়েছে। অথচ এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনও আলোচনাই করা হয়নি।
খয়রাশোলের বিডিও সঞ্জয় দাস আদিবাসীদের প্রতিবাদপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলছেন, ‘‘কয়লা খনি তৈরির জন্য কারও বসতে হাত পড়ছে না। তবে কয়লা খনি লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের যাতে সমস্যা না হয়, তা নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের  দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কথা বলা হবে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও।’’
স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৪ সালে কয়লার ব্লক-বণ্টন বাতিল হওয়ার আগে খয়রাশোলের কৃষ্ণপুর-বড়জোড় ও গঙ্গারামচক মৌজার মাটির নীচে কয়লা উত্তোলনের বরাত পায় এমটা। সেই কয়লা বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল ওই সংস্থার। ২০১১ সালের পর থেকে কৃষ্ণপুর-বড়জোড় অঞ্চল এবং তার পরে গঙ্গরামচকে কিছু অংশে খোলামুখ খনি গড়ে কয়লা উত্তোলন শুরু করেছিল তারা। কিন্তু ২০১৪ সালে সারা দেশে ২০৪টি কোল-ব্লক বাতিলের তালিকায় ছিল  খয়রাশোলের দুটি ব্লক-ও।
২০১৫ সালে নয়া কয়লা ব্লক বণ্টন আইনের আওতায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুত উন্নয়ন নিগম রাজ্যে যে পাঁচটি কোল ব্লক থেকে কয়লা উত্তোলনের দায়িত্ব পায়, সেই তালিকায় নাম ওঠে খয়রাশোলের বড়জোড় ও গঙ্গারামচক মৌজার। কিন্তু পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না মেলায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে কয়লা উত্তোলন করা যায়নি। জট কাটিয়ে ২০১৭ সালের শেষ দিকে খয়রাশোলের কৃষ্ণপুর-বড়জোড় মৌজা থেকে কয়লা উত্তোলনের প্রস্ততি শুরু করলেও জটিলতা ছিল গঙ্গারাপুর নিয়েই। কারণ এই মৌজার একটি বড় অংশে ছিল বিশাল জঙ্গল। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, নিয়ম মেনে ১০১ হেক্টর জায়গা নিজেদের নামে নিয়ে সেখানে জঙ্গল কাটাচ্ছে নিগম।
তা নিয়েই আপত্তি তুলছেন প্রস্তাবিত কয়লাখনি লাগোয়া এলাকার আদিবাসীরা। বাবুরাম পাঁউরিয়া, সুমিতা সরেন, তাপস মারান্ডি, মলিন্দ টুটু, সোমনাথ হেমব্রমের মতো এলাকাবাসীর অভিযোগ, বনভূমি কেটে ফেলায় তাঁদের জীবন-জীবিকায় আঘাত আসবে। জ্বালানি কাঠ, শালপাতা, কেন্দু পাতা, খেজুর, মধু, পিয়াল ফল সবই তাঁরা সংগ্রহ করেন জঙ্গল থেকে। জঙ্গল না থাকলে সেই পথ বন্ধ হবে। পাশাপাশি থাকবে না প্রচুর বন্যপ্রাণ।
তাঁদের আরও আশঙ্কা, কয়লাখনি থেকে তাঁদের বসতের দূরত্ব মাত্র ২-৩ কিলোমিটার। আগামী দিনে কয়লা উত্তোলন শুরু হওয়ার পরে বিস্ফোরণ ঘটালে ফাটল ধরতে পারে তাঁদের মাটির বাড়িতে। দূষিত হবে পরিবেশও।
বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জিএম অমরকুমার পাল বলছেন, ‘‘এ বিষয়ে আমার কানে কিছু আসেনি।’’ বন দফতর জানিয়েছে, বনভূমি নষ্ট হয়েছে, তাই কমপেনসেটারি অ্যাফোরেস্টেশন ফান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং অথরিটিকর্মসূচির আওতায় সম-পরিমাণ এলাকায় নতুন করে গাছ লাগানো হবে। তবে এটাও ঠিক, সেখানে ঘন জঙ্গল তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
কিন্তু জঙ্গলভূমি ধ্বংস করে কয়লাখনি তৈরি বিরুদ্ধে আদিবাসীরা তাদের বিরোধিতায় অনড়। আর তাই বীরভূমের জোড়া কয়লা প্রকল্পের শুরুতেই জট। এবার সরাসরি রাস্তায় নেমে দেওচা-পাচামি কয়লা প্রকল্প ও খয়রাশোলে গঙ্গারামচক খোলামুখ কয়লা খনি ঘিরে আন্দোলনে নামল আদিবাসীরা। জঙ্গল কেটে এবং আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে কয়লা শিল্প করা যাবে না দাবি জানিয়ে বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হলেন তারা।
দিন চারেক আগে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন বীরভূমের দেওচা-পাচামি কয়লা শিল্প সংক্রান্ত ফাইল কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যকে হস্তান্তর করেছে। তাঁর ঘোষণার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয় বীরভূমে। লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের আশায় শিল্পকে স্বাগত জানায় যুব সমাজ। যদিও পাথর খাদান ও ক্রাশার মালিকরা ছাড়াও এলাকার আদিবাসীরা এই ঘোষণায় আশঙ্কাই দেখছে বেশি।
আদিবাসীরা যে শুধু মুখে স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার কথা বলেছেন এমনটা নয়। তাদের দাবিতে আগামী দিনেও যে অনড় থাকবেন তা বুঝিয়ে দিয়েছেন গত সোমবার (২২/০৭/২০১৯)। এ দিন একযোগে বীরভূমের তিনটি জায়গায় জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়। মহম্মদবাজারের জয়পুরে, সিউড়ির আব্দারপুর, ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন আদিবাসী সংগঠন বীরভূম আদিবাসী গাঁওতা। একই সঙ্গে রামপুরহাটের বড়পাহাড়িতেও রামপুরহাট-দুমকা রাস্তা অবরোধ করা হয়।
খয়রাশোল ব্লকে গঙ্গারামচক মৌজায় পিডিসিএল খোলামুখ কয়লা খনির জন্য ১০১ একর বনভূমি কাটার কাজ শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত খনি এলাকার বাস্তবপুর, সগরভাঙ্গা, বেলডাঙা, ভাদুলিয়া, গঙ্গারামচক, দেবগঞ্জ এলাকার আদিবাসীরা ইতিমধ্যেই এই নিয়ে একজোট হতে শুরু করেছেন। আদিবাসীদের অভিযোগ, বনভূমি কেটে নিলে তাঁদের রুজিতে টান পড়বে। কারণ, জঙ্গল থেকে কাঠ, মধু, কেন্দুপাতা, শালপাতা, সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে আদিবাসী সমাজ। এলাকার বাসিন্দা বুধন হেমব্রম, রবি টুডুদের বক্তব্য, “জঙ্গল ধ্বংস করে কয়লা খাদান হলে আমাদের উচ্ছেদ হতে হবে। যদি তা নাও হয় তবে খাদানে বিস্ফোরণ হলে আমাদের মাটির বাড়ি ভেঙে পড়বে।” যদিও বন দপ্তরকে পিডিসিএল আশ্বাস দিয়েছে ওই পরিমাণ এলাকায় বনসৃজন করবে তারা।
স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন “বীরভূম আদিবাসী গাঁওতা”-র সম্পাদক রবীন সরেন বলেন, “খয়রাশোলের গঙ্গারামচকে জঙ্গল ধ্বংস করে কয়লা খাদান করা হচ্ছে। কয়লা শিল্প হলে সেখানেও কেটে ফেলা হবে প্রচুর জঙ্গল। প্রায় তিরিশটি আদিবাসী গ্রামকে উচ্ছেদ করা হবে। ফলে কয়লা শিল্প হোক তা আমরা চাই না।” বীরভূম আদিবাসী গাঁওতার আন্দোলনে দেওচা-পাচামি কয়লা শিল্প ঘোষনার পর বড় আঘাত এল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বীরভূম আদিবাসী গাঁওতার নেতাদের বক্তব্য, “আমরা শিল্পের বিপক্ষে নয়। কিন্তু আদিবাসী স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে সরকারকে। কয়লা শিল্প নিয়ে এখনও মানুষ কিছুই জানে না। তাদের কাছে সমস্ত বিষয় স্পষ্ট করতে হবে।” যদিও এই প্রসঙ্গে জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু বলেন, “জেলার যে কোনও উন্নয়নের কাজে আদিবাসীদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় আমরা তা খতিয়ে দেখব।”
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা (১৮/০৭/২০১৯) ও এইসময় (২৩/০৭/২০১৯)।

Monday, July 22, 2019

পশ্চিম বর্ধমানের হীরাপুরে প্রেমিককে বেঁধে রেখে আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৬।


প্রেমিককে মারধর করে বেঁধে রেখে আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগে শনিবার তিনজন যুবককে ও রবিবার আরও ৩ জন সমেত মোট ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস। গত বুধবার (১৭/০৭/২০১৯) রাতে হীরাপুর থানার সূর্যনগর এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আসানসোল দক্ষিণ থানার কুমারপুর এলাকার এক আদিবাসী তরুণী ও হীরাপুর থানার বেগুনবাড়ি এলাকার এক আদিবাসী যুবকের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা বুধবার সন্ধ্যায় হীরাপুর থানার সূর্যনগর এলাকায় দামোদর নদের তীরে ঘুরতে যান। অভিযোগ, রাতে ওখানে তাঁদের আটকায় পাঁচ যুবকপ্রেমিক যুগলকে জোর করে কাছেই একটি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ব্যাপক মারধর করে। এরপর প্রেমিকের সামনেই প্রেমিকাকে গণধর্ষণ করে তারা।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই আদিবাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে শনিবার হীরাপুর থানায় বিক্ষোভ দেখানো হয় এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, যে পাঁচজনের নামে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজনকে স্থানীয় পাঠমোহনা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের একদিন পরেই গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয় এবং গোপন জবানবন্দি নেওয়া হয়। এডিসিপি(পশ্চিম) অনমিত্র দাস বলেন, একটি গণধর্ষণের অভিযোগ হয়েছে। পাঁচজনের নামে অভিযোগ রয়েছে।
গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে সুনীল বাউরি, রুপ লাহিড়ী, কাটি হাঁসদা, চিরঞ্জিত দাস, রাজেশ কর্মকার, টোটোই হেমরম। গণধর্ষণের ঘটনার মূল পাণ্ডা টোটোই হেমরম। সব অভিযুক্ত ধরা পড়ায় খুশি আদিবাসী সংগঠনের নেতা কর্মীরা। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন স্থানীয় আদিবাসীরা। দুই সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্বে স্থানীয় আদিবাসীরা ধামসা মাদল নিয়ে হীরাপুর থানা ঘেরাও করায় চরম চাপে ছিলেন পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। সব অভিযুক্ত ধরা পড়ায় হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা।
সংবাদ সৌজন্য – বর্তমান (২১/০৭/২০১৯)। ছবি - প্রতীকী। 

শোনভদ্রে জমি বিবাদে ১০ জন আদিবাসী মারা যাবার চার দিন পরে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।

উত্তরপ্রদেশের শোনভদ্রে জমি বিবাদে ১০ জন আদিবাসী মারা যাবার চার দিন পরে অবশেষে সেখানে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।

গত বুধবার (১৭/০৭/২০১৯) উত্তরপ্রদেশের শোনভদ্রে দশ আদিবাসীর মৃত্যুর চার দিন পরে অবশেষে সেখানে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ওই ঘটনার পরেই কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরার সফরকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি তোলপাড় হয়েছে। অবশেষে চাপের মুখে সোনভদ্রে যাওয়ার কথা গত কাল জানান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথএবং চার দিন পরে ঘটনাস্থলে পা রেখে টেনে আনলেন সেই দলীয় রাজনীতিই।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী মৃতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণার পাশাপাশি গোটা ঘটনার দায় চাপালেন রাজ্যে তিন দশক আগে শেষ বার ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস সরকারের ঘাড়ে। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকারের দলিত-বিরোধী মনোভাব নিয়ে বিরোধীদের সব অভিযোগ উড়িয়ে যোগীর দাবি, শোনভদ্রের ঘটনা আসলে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় মাপের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। যার পিছনে রয়েছে কংগ্রেস। মূলত যার সঙ্গে পাল্লা দিতে যোগীর আজকের সফর বলে মনে করা হচ্ছে, সেই প্রিয়ঙ্কা এই সফরকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘দেরিতে হলেও পীড়িতদের পাশে দাঁড়ানো সরকারের কর্তব্য।’’
গত শুক্রবার নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যে ভাবে প্রিয়ঙ্কা গাঁধী উত্তরপ্রদেশে ছুটে বেড়িয়েছেন, তাতে ঘুম ছুটেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। বিশেষ করে গত কাল যে ভাবে নির্যাতিতরা প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে দেখা করার জন্য জোট বেঁধেছিলেন, তাতে অশনি সঙ্কেত দেখছে গেরুয়া শিবির। তাই দিল্লির সদর দফতর থেকে আদিত্যনাথকে বার্তা দেওয়া হয়, দ্রুত পীড়িতদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই আজ সোনভদ্রে পৌঁছন আদিত্যনাথ। কংগ্রেস নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাকে টেক্কা দিতে সাড়ে ১৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেন যোগী। শুরুতে ক্ষতিপূরণের এই অঙ্কটাই ছিল মাত্র ৫ লক্ষ টাকা।
কিন্তু তাতেও মানুষের ক্ষোভ কমছে না। আজ আদিত্যনাথের সামনেই অনেক গ্রামবাসী নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, কী ভাবে পুলিশের মদতে সে দিন হামলা চালানো হয়েছিল। অবিলম্বে গ্রামে নিরাপত্তার বাড়ানোর দাবি তুলেছেন গ্রামবাসীরা। দাবি উঠেছে পলাতক অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারেরও। অন্যদিকে রাজীব-কন্যা টুইট করে বলেন, ‘‘নির্যাতিতদের সমর্থনে কয়েক হাজার কংগ্রেস কর্মী পথে নামার পরেই উত্তরপ্রদেশ সরকার বুঝতে পারে যে, বিষয়টি গুরুতর। দেরিতে হলেও যোগীর সোনভদ্র সফরকে স্বাগত। সরকারের উচিত পীড়িতদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ওই গ্রামটি ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় রয়েছে। আশা করি, তাঁদের পাঁচ দফা দাবি মেনে আজ মুখ্যমন্ত্রী যা ঘোষণা করেছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। আদিবাসীদের জমির মালিকানা দেওয়ার পাশাপাশি দোষীদের দ্রুত সাজা এবং গ্রামবাসীরা যেন পূর্ণ সুরক্ষা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।’’
মোদী সরকারের প্রথম পর্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলিত ও আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের ঘটনায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গো-রক্ষার নামে দলিতদের উপর আক্রমণ, মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁও সংঘর্ষ, উত্তরপ্রদেশের মুজফফ্‌রনগরের দলিত ও উচ্চবর্ণের সংঘর্ষের একের পর এক ঘটনায় ব্যাপক মুখ পোড়ে বিজেপির। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে মোদী যতই সবকা সাথ, সবকা বিকাশের পাশাপাশি সবকা বিশ্বাসজেতার দাবি করুন না কেন, দেশের নানা প্রান্তে দলিত-নির্যাতনের ঘটনা কিন্তু ঘটেই চলেছে। তার মধ্যেই শোনভদ্রের ঘটনা নতুন করে অস্বস্তির মুখে ফেলেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। ফিরিয়ে এনেছে মোদী সরকারের প্রথম পর্বের স্মৃতিকেই।
সরকারের দায় এড়াতে গত কাল থেকেই গোটা ঘটনার জন্য তিন দশক আগের কংগ্রেস সরকারের নীতিকে দায়ী করে দফায় দফায় সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী ও তাঁর দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী।। আজও শোনভদ্রে দাঁড়িয়ে আদিবাসী হত্যার পিছনে বড় মাপের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব তুলে যোগী বলেন, ‘‘ওই জমিটি ১৯৫৫ সালে একটি ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় থাকাকালীন ফের ওই জমি ব্যক্তিগত মালিকদের ফিরিয়ে দেয়। সেই ব্যক্তিগত মালিকেরা ২০১৭ সালে জমিটি গ্রামপ্রধানকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।’’ যোগীর দাবি, তাতে মদত দিয়েছিল কংগ্রেসই। যোগীর মতে, কংগ্রেসের সেই পাপের ফলই ভোগ করতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের।
শোনভদ্রে জমি হিংসায় নিহত দশ আদিবাসী পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের চরম বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। তবু নাছোড় থেকে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। সমর্থন করেছিলেন তাঁদের দাবিদাওয়াকে। রাজনৈতিক চাপে পড়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সে ঘটনার ঠিক পর দিনই পৌঁছে গেলেন এলাকায়। আশ্বাস দিলেন ক্ষতিপূরণের, ন্যায়বিচারের।
ইতিহাস বলছে, আদিবাসী কৃষকরা বহু বছর ধরে ওই জমিতে অর্থের বিনিময়ে চাষ করে আসছেন। সেই নিয়ে গন্ডগোলের জেরেই যজ্ঞ দত্তের লোকজন গুলি চালায়, যাতে দশ জনের মৃত্যু হয়। আদিত্যনাথ এ দিন আশ্বাস দেন, ওই জমিতে যে সব আদিবাসী চাষ করছিলেন তাঁরাই করবেন। নিহত ও আহতদের বাড়তি ক্ষতিপূরণের আশ্বাস-ও মিলেছে। আদিত্যনাথের কটাক্ষের পর অবশ্য টুইটারে সরব হন প্রিয়াঙ্কা। লেখেন, ‘ন্যায়বিচারের জন্য কংগ্রেস কর্মীদের দাবিদাওয়ার পরই সরকার বুঝেছে বিষয়টি ঠিক কতটা গুরুতর। আশা করব, সরকার যে সব ঘোষণা করেছে তা পূরণ করবে। আদিবাসীদের জমির মালিকানা পাওয়া উচিত।
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা ও এইসময়, ২২/০৭/২০১৯।

Sunday, July 21, 2019

সোনভদ্র গ্রামের আদিবাসীরা পরের পর প্রজন্ম চাষ করলেও উত্তরপ্রদেশের সরকারের থেকে জমির অধিকার বা পাট্টা মেলেনি।

সোনভদ্র গ্রামের আদিবাসীরা পরের পর প্রজন্ম চাষ করলেও উত্তরপ্রদেশের সরকারের থেকে জমির অধিকার বা পাট্টা মেলেনি।

উত্তরপ্রদেশের সোনভদ্র গ্রামের আদিবাসীদের চাষ করার জন্য নিজেদের কোন জমি ছিল না। উত্তরপ্রদেশের ওই এলাকায় অধিকাংশ জমির মালিক গুজ্জর জনগোষ্ঠীর মানুষরা। গুজরদের মালিকানাধীন জমিতেই আদিবাসীরা ভাড়া দিয়ে চাষ করতেন। বছরে বিঘা প্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া জমির মালিকের হাতে ভাড়া গুণে দিতে হত সোনভদ্রের গোন্ড আদিবাসী পরিবারগুলিকে। তার বিনিময়েই জমি চাষ করতে লাঙল নিয়ে মাঠে নামার ছাড়পত্র মিলত। সঙ্গে ছিল মৌখিক আশ্বাস। এই জমি কখনও বিক্রি করা হবে না।
১৯৫৫ থেকে এ ভাবেই আদিবাসীরা জমি ভাড়ায় নিয়ে চাষ করছিলেন। কিন্তু পরের পর প্রজন্ম চাষ করলেও উত্তরপ্রদেশের সরকারের থেকে জমির অধিকার বা পাট্টা মেলেনি। প্রশাসনের কাছে হাত জোড় করাটাই বিফলে গিয়েছে। শেষে সেই জমি দখলের সামনে রুখে দাঁড়াতে গিয়েই প্রাণ দিতে হল আদিবাসীদের।
সোনভদ্রে আদিবাসী কৃষকদের উপর গুলি চালনার ঘটনায় অনেকেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছায়া দেখছেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শিল্পের জন্য সরকার চাষিদের জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়েছিল। সোনভদ্রে জমির দখল নিতে গিয়েছিল গ্রামপ্রধান। আদিবাসীদের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে সেই জমিই পরে বেসরকারি শিল্প সংস্থাকে বেচে দেওয়া হতো বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ।
সমাজকর্মীরা জানাচ্ছেন, আদিবাসীরা ওই জমিতে চাষ করেন। পরের পর প্রজন্ম ভিটে তৈরি করে বাস করেন। কিন্তু জমির পাট্টা পান  না তাঁরা। তারপর আচমকা সেই জমি কারখানার জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু পাট্টা না থাকায় এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ পান না আদিবাসীরা। গোটা দেশের এই সমস্যাই সোনভদ্রের হিংসার মূলে রয়েছে বলে মনে করছেন সামাজিক আন্দোলনকারীরা। ইউপিএ সরকার জঙ্গলের জমিতে আদিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে অরণ্যের অধিকার আইন এনেছিল। কিন্তু সেই আইন মেনেও বনবাসীদের পাট্টা না দেওয়ায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১০ লক্ষ বনবাসীর ভিটেমাটি ছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সোনভদ্রের জমি জঙ্গলের জমি না হলেও, সেখানেও আদিবাসীদের জমির উপরে কোনও অধিকার ছিল না। কংগ্রেস নেতা রণদীপ সুরজেওয়ালার অভিযোগ, ‘‘আদিত্যনাথের সরকার বেআইনি ভাবে জমি গ্রামপ্রধান যজ্ঞদত্ত ভুরিয়ার নামে হাতবদল করে দেয়।’’
তথ্য বলছে, সোনভদ্রের ৯০ বিঘা জমিতে গোন্ডেরা ১৯৫৫ থেকে চাষ করছিলেন। ওই জমিই ছিল তাঁদের ভিটেমাটি। ১৯৫৫-তে আদর্শ সমবায় সোসাইটি’-র জমি বেচা হয়। কিন্তু ১৯৬৬-তে সোসাইটির মেয়াদ ফুরোনোর পরে জমির কোনও মালিকানা ছিল না। ১৯৮৯-তে সোনভদ্রের প্রাক্তন জেলাশাসক প্রভাত মিশ্র জমি নিজের নামে করে নেন। ২০১৭-য় সেই জমিই গ্রামপ্রধান যজ্ঞদত্তকে বেচা হয়। সোনভদ্রের পরিস্থিতি দেখে ফেরা সিপিএমের প্রতিনিধি দলের নেতা হীরালাল যাদবের অভিযোগ, ‘‘যোগী সরকারের প্রত্যক্ষ মদতেই আদিবাসীদের জমি হাতবদল হয়।’’ গত ৬ জুলাই আদিবাসীরা জেলা প্রশাসনের কাছে আর্জি জানান। তা খারিজ হয়ে যায়। এরপরেই ১৭ জুলাই জমি দখল করতে গিয়ে যজ্ঞদত্তের গুণ্ডাবাহিনী গুলি চালায়। যজ্ঞদত্ত গুজ্জর সমাজের সদস্য। উত্তরপ্রদেশের ওই এলাকায় অধিকাংশ জমির মালিক এই গুজ্জররাই।
আদিবাসী অধিকার আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশের সোনভদ্র জেলাতেই অরণ্যের এলাকা সবচেয়ে বেশি। অথচ অরণ্যের অধিকার আইনে সোনভদ্রের সিংহভাগ আদিবাসীর পাট্টার দাবি খারিজ হয়ে গিয়েছে। কয়েক দশকের দাবির পরে গোন্ডেরা ২০০২-তে তফসিলি জনজাতির মর্যাদা পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জমি থেকে উৎখাত করে বাঁধ, কয়লা খনি, অ্যালুমিনিয়াম ও সিমেন্ট কারখানা তৈরি হয়েছে। এ বারও সোনভদ্রের উমভা গ্রামে সেই লক্ষ্যেই জমি দখল করার চেষ্টা হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
সংবাদ সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ২১/০৭/২০১৯।

Saturday, July 13, 2019

ঝাড়গ্রামে শিবির করে লোধা-শবরদের কাস্ট সার্টিফিকেট দেবে জেলা প্রশাসন।

ঝাড়গ্রাম জেলায় লোধা-শবর পরিবারগুলির জন্য শিবির করে শীঘ্রই কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ শুরু হচ্ছে। গত শনিবার ১৩/০৭/২০১৯ ঝাড়গ্রাম শহরের কদমকানন ও শিরীষচক এলাকায় শবর পরিবারগুলির তথ্য সংগ্রহ শুরু করল জেলা আদিবাসী দপ্তর। জেলায় এখনও অনেক শবর পরিবারের কাস্ট সার্টিফিকেট নেই। জানা গিয়েছে, আধার কার্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথির অভাবে এতদিন কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। জেলাশাসক উদ্যোগ নিয়ে এই সমস্যা মেটাতে এবার তথ্য অনুসন্ধানের পরে শিবির করে কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে শবরদের আর সরকারি অফিসে যেতে হবে না। এলাকায় তাঁদের হাতে কাস্ট সার্টিফিকেট তুলে দেবেন প্রশাসনের আধিকারিক ও কর্মীরা।
এর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা যোজনায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্যও গ্রামে শিবির করার উদ্যোগ নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। গতবছর থেকে সামাজিক সুরক্ষা যোজনায় শবরদের নাম নথিভুক্ত করার কাজ শুরু হয়। গতবছর নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জেলায় ১১৭৫ জন শবরের নাম প্রকল্পে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৫৭৫ জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এখনও ৬০০ জনের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়নি। জেলায় এখনও প্রায় দেড় হাজার শবর পরিবারের কাছে কাস্ট সার্টিফিকেট নেই।
অভিযোগ, কাস্ট সার্টিফিকেট না থাকায় লোধা-শবররা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না। পড়াশোনার ক্ষেত্রে তারা নিজেদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই শবরদের শিক্ষাগতভাবে এগনোর ক্ষেত্রে এই কাস্ট সার্টিফিকেট খুবই প্রয়োজন। কিন্তু, উপযুক্ত নথির অভাবে তাঁরা এই সার্টিফিকেট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। অনেকের আবার সরকারি অফিসে গিয়ে সার্টিফিকেট তৈরির ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। তাই প্রশাসনই এবার শবর অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে দুয়ারে আসছে, যাতে তাঁরা সামাজিকভাবে নানা দিক থেকে মূলস্রোতে আসতে পারে।
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ৪০ হাজার শবর রয়েছে। এরমধ্যে ঝাড়গ্রাম জেলায় ১৮ হাজার শবর সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। ঝাড়গ্রাম জেলায় শবরদের উন্নয়নের জন্য গতবছর ডিসেম্বর মাসে ১০ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। ওই টাকা বাংলার আবাস যোজনায় বাড়ি, বাড়ি সংস্কার, পরিস্রুত পানীয় জল, স্ব-সহায়ক দলের গোষ্ঠীদের আর্থিক ভাবে স্ব-নির্ভর করার জন্য পশুপালন, স্কিল ডেভলপমেন্ট সহ একাধিক কাজ চলছে।
জেলাশাসক আয়েষা রানি বলেন, এখনও কিছু শবর পরিবারের কাস্ট সার্টিফিকেট নেই। তাই শবরদের গ্রামে শিবির করে কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।
সংবাদ সৌজন্য – বর্তমান, ১৪/০৭/২০১৯। ছবি – প্রতীকী।