Tuesday, March 13, 2018

ভারতীয় ভাষা-উপভাষা সংরক্ষণের দাবি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের।


বিদেশি ভাষা শিক্ষায় আপত্তি নেই সঙ্ঘের। কিন্তু গোটা দেশে স্থানীয় ভারতীয় ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা। এখনও যে সব ভারতীয় ভাষায় ইউপিএসসি বা এনইইটি-র মতো সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা হয় না, সেগুলি অবিলম্বে শুরুর দাবি জানিয়েছে সঙ্ঘ।
নাগপুরে অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভার তিন দিনের বৈঠক শেষ হওয়ার পরে এ দিন সাংবাদিক সম্মেলন করেন আরও তিন বছরের জন্য সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া সুরেশ ভাইয়াজি জোশী। তিনি ঘোষণা করেন, আদালতের রায়ের জন্য তাঁরা অপেক্ষা করবেন। কিন্তু রামের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত ওই বিতর্কিত জমিতে রাম মন্দিরই হবে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের শ্রম ও কৃষি নীতি নিয়ে সমালোচনার সুর শোনা গিয়েছে ভাইয়াজির মুখে।
বৈঠকে একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদেশি ভাষার বহুল ব্যবহারে দেশজ সংস্কৃতির বাহক ভারতীয় ভাষাগুলির অনেক উপভাষা ও বাগ্‌ধারা হারিয়ে গিয়েছে। তাই এগুলির যোগ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে সরকারগুলিকে পদক্ষেপ করতে হবে। এ ছাড়া, সামাজিক, পারিবারিক এবং দৈনন্দিন কাজেও মাতৃভাষাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আদালত ও প্রশাসনিক কাজেও ইংরেজির বদলে ভারতীয় ভাষা ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে সওয়াল করে সঙ্ঘ। এমনকী, বেসরকারি সংস্থার কাজ, নিয়োগ এবং পদোন্নতিতেও স্থানীয় ভারতীয় ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়। প্রস্তাবে এ কথাও বলা হয়েছে — মাতৃভাষার ওপর স্বাভিমান বজায় রেখে অন্য ভাষার প্রতি সম্মানের মনোভাব বজায় রাখতে হবে।
বৈঠকে সঙ্ঘের সাংগঠনিক নেতৃত্বে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। ভাইয়াজি জোশীকে সাহায্যের জন্য মনমোহন বৈদ্য ও মুকুন্দকেও সুরেশ সোনী, দত্তাত্রেয় হোসবোলে, কৃষ্ণগোপাল ও ভাগাইয়ার সঙ্গে সহ-সাধারণ সম্পাদক (সহ সরকার্যবাহ) পদে এনেছে প্রতিনিধি সভা। অখিল ভারতীয় প্রচার প্রমুখ নিযুক্ত করা হয়েছে অরুণ কুমারকে।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২/০৩/২০১৮।

মুম্বইয়ের সাফল্যের পর এ বার ডাক ‘দিল্লি চলো’ কৃষক সংগঠনগুলির।




মহারাষ্ট্রে বেনজির সাফল্য। এ বার তাই লক্ষ্য দিল্লি। শ’দুয়েক কৃষক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটির (এআইকেএসসিসি) ডাকে এ বার দিল্লি অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হল। রাজ্যে রাজ্যে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ ইতিমধ্যেই অনেকটা সেরে ফেলেছে সংগঠনগুলি। দিল্লিতে বেনজির জমায়েতের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রস্তুতি, খবর কোঅর্ডিনেশন কমিটি সূত্রের।
দেশের এমন কোনও প্রান্ত নেই, যেখানে কৃষক বিক্ষোভ হচ্ছে না। একাধিক রাজ্যে সেই বিক্ষোভ হিংসাত্মক ঘটনার রূপও নিয়ে নিয়েছে। ২০১৭-র জুনে বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে গুলি চলে বিক্ষোভকারীদের উপরে। তাতে উত্তাল হয়ে যায় গোটা দেশের রাজনীতি। সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক অসন্তোষ আরও বেড়ে যায় গোটা দেশে।
মন্দসৌরের ঘটনাই এক ছাতার তলায় আনে শতাধিক কৃষক সংগঠনকে। মহারাষ্ট্রে সফল কৃষক আন্দোলন হল যে সংগঠনের নেতৃত্বে, সেই সারা ভারত কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক তথা সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য হান্নান মোল্লা আনন্দবাজার ডিজিটালকে বললেন, ‘‘মন্দসৌরে গুলিচালনার পরে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। আরও অনেক কৃষক সংগঠনের নেতৃত্ব গিয়েছিলেন। সেখানেই আমাদের মধ্যে কথা হয়, আমরা এক ছাতার তলায় আসার সিদ্ধান্ত নিই।’’
জুনের প্রথম সপ্তাহে গুলি চলেছিল মন্দসৌরে। জুনের তৃতীয় সপ্তাহেই দিল্লিতে বৈঠকে বসে ১২০টি কৃষক সংগঠন। গড়ে ওঠে অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি। বিভিন্ন রাজ্যে একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজিত হয় কমিটির ব্যানারে। ২০১৭-র নভেম্বরে ‘সংসদ চলো’র ডাক দেয় কমিটি। তত দিনে ১২০ থেকে বেড়ে ১৮৪টি সংগঠন যোগ দিয়েছে কোঅর্ডিনেশন কমিটিতে। তবে নভেম্বরের সেই কর্মসূচি তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।
সাড়া জাগিয়ে দিল মুম্বই তথা মহারাষ্ট্র। সে রাজ্যে কৃষকদের ‘লং মার্চ’ যে ভাবে শিহরণ জাগালো গোটা দেশে, তাতে ফের উৎসাহিত কোঅর্ডিনেশন নেতারা। কমিটি সূত্রের খবর, এপ্রিলের শেষে বা মে মাসের শুরুতে হবে দিল্লি অভিযান। অসমের কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মুখ তথা কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতির প্রধান অখিল গগৈ আনন্দবাজার ডিজিটালকে বললেন, ‘‘এপ্রিলের শেষে বা মে মাসের শুরুতেই দিল্লি অভিযান হবে। মহারাষ্ট্রের ছবিটা আপনারা তো দেখলেনই। শুধু একটা রাজ্যেই এই জমায়েত। সবক’টা রাজ্যের কৃষক সংগঠন মিলে দিল্লিতে কত বড় জমায়েত করবে, বুঝতেই পারছেন।’’ কোঅর্ডিনেশন কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা অখিল। তাঁর দাবি, অসম থেকে অন্তত ১০ হাজার কৃষক যোগ দেবেন দিল্লির বিক্ষোভে।
হান্নান মোল্লা অবশ্য দিল্লি অভিযানের দিনক্ষণ সম্পর্কে এখনই মন্তব্য করতে চাইলেন না। এপ্রিল-মে’র দিকেই দিল্লিতে জমায়েতের ভাবনাচিন্তা যে চলছে, সে কথা স্বীকার করলেন। তবে বললেন, ‘‘১৭ মার্চ এআইকেএসসিসি-র স্টিয়ারিং কমিটি বৈঠকে বসবে। সেখানেই স্থির করা হবে পরবর্তী কর্মসূচি।’’
ঠিক কোন কোন দাবি নিয়ে দিল্লি অভিযান করতে চলেছে এআইকেএসসিসি?
হান্নান-অখিলরা কথায় কথায় জানালেন, কৃষকদের সমস্যা অনেক রকমের। কিন্তু সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধানের দাবি নিয়ে ঝাঁপাবে না কমিটি।
মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, রাজস্থান— বৃষ্টিপাত বা জলের অভাবে ভুগছেন এতগুলি রাজ্যের কৃষক। কোথাও বছরের পর বছর বৃষ্টি নেই। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত। কোথাও সেচের জল নেহাতই অপ্রতুল।
গুজরাতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সরকার দাবি করেছিল, নর্মদা প্রকল্পের সুবাদে সেচের সমস্যা মিটে গিয়েছে। গুজরাতের বিভিন্ন নদীতে এবং সেচ ক্যানালে পর্যাপ্ত টলটলে জল দেখতেও পাওয়া যাচ্ছিল ভোটের মরসুমে। কিন্তু ভোট মিটতেই জলে টান পড়েছে। এ বার গ্রীষ্মে সেচের জল কতটুকু জোগানো যাবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ভোটের মরসুমে নদী-নালা ভরিয়ে রাখতে এত বেশি জল ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল জলাধারগুলি থেকে যে, গ্রীষ্মে জলের টান অবধারিত। এমন কথা শোনা যাচ্ছে গুজরাতের প্রতিটি প্রান্তে।
সমস্যা আরও রয়েছে। দেশের প্রায় সব রাজ্যে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন বিপুল সংখ্যক কৃষক। কোথাও ঋণের পরিমাণ কম, কোথাও বেশি। কিন্তু কৃষক ঋণগ্রস্ত প্রায় সর্বত্রই। একের পর এক মরসুমে যে ভাবে মার খাচ্ছেন কৃষকরা, তাতে ঋণের ফাঁস চাষির গলায় আরও চেপে বসেছে। অবিলম্বে ঋণ মকুব তাই কৃষকের অন্যতম প্রধান দাবি এই মুহূর্তে।
ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কৃষক সংগঠনগুলির হাতে অন্যতম প্রধান ইস্যু। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সংসদে যে বাজেট পেশ করেছেন, তাতে ফসল ফলানোর খরচের দেড়গুণ অর্থ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য হিসেবে কৃষককে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আদৌ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে কৃষকদের সংশয় বিস্তর।
পূর্ববর্তী বাজেটে ফসল বিমা যোজনা ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। কোন রাজ্যে ক’জন কৃষক এই বিমার সুবিধা পেলেন, তা দূরবীন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না। অতএব, জেটলির ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আদৌ কৃষকের হাতে পৌঁছবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকা স্বাভাবিক।
উত্তর-পূর্ব ভারতে আবার একটু অন্য রকম ছবি। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য না পাওয়ার সমস্যা সেখানেও রয়েছে। এফসিআই কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কেনে না বলে অভিযোগ। সমস্যা আরও অনেক রকমের। অখিল গগৈ বললেন, ‘‘মূল সমস্যা নদীর ভাঙন। ১৯৬৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত অসমের চাষযোগ্য জমির ৮ শতাংশ তলিয়ে গিয়েছে। দেশের মধ্যে অসমেই সবচেয়ে বেশি বন্যা হয়। কোনও কোনও এলাকা বছরে পাঁচ-ছ’বার বন্যায় ভেসে যায়। অসমে ২৮ শতাংশ কৃষকের জমিই নেই। আর ৩২ শতাংশ হলেন প্রান্তিক কৃষক, অর্থাৎ তাঁদের জমির পরিমাণ সাড়ে তিন বিঘারও কম। সরকারি সহায়তা ছাড়া কৃষকরদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’’
ভরসা তাই পথে নামা। বলছেন গোটা দেশের প্রায় প্রতিটি কৃষক সংগঠনের নেতারাই। যে ভাবে মুম্বই কাঁপিয়ে দিয়েছে কৃষক বিক্ষোভ, ঠিক সেই ভাবেই এ বার দিল্লিতে পা রাখতে চাইছে কৃষক সংগঠনগুলি। দাবি মূলত দু’টি — কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মকুব, ফসল ফলানোর খরচের অন্তত দেড়গুণ মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে শস্য কিনে নেওয়া। মহারাষ্ট্রে ঝান্ডাটা ছিল সারা ভারত কৃষক সভার। দিল্লিতে জমায়েত হতে চলেছে কোঅর্ডিনেশন কমিটির ব্যানারে।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়, ১৩/০৩/২০১৮।

Sunday, March 11, 2018

মুম্বইের রাস্তাঘাট-মাঠময়দানে স্রোতের মতো ঢুকছে কৃষিজীবী-আদিবাসী-ভূমিহারা মানুষের ঢল।





গোটা ভারতের চোখ আজ মুম্বইয়ের দিকে। চোখ টানছে এক সুদীর্ঘ রক্তাভ মিছিল। ক্রোশ ক্রোশ পথ পেরিয়ে মহারাষ্ট্রের খরাক্লিষ্ট, ফলনবঞ্চিত প্রান্তগুলো থেকে শত-সহস্র কৃষক হাঁটছেন মুম্বইয়ের দিকে, ক্রমশ ভরে উঠছে মুম্বই, রাস্তাঘাট-মাঠময়দানে স্রোতের মতো ঢুকছে কৃষিজীবী-আদিবাসী-ভূমিহারা মানুষের ঢল।
বামপন্থী কৃষক সংগঠনের উদ্যোগেই মূলত এই বিপুল জমায়েত মুম্বইয়ে। দেশে বাম মতাদর্শের প্রবাহে যখন ভাটার টান, আড়াই দশকের পুরনো দুর্গও যখন ধসে পড়ছে শোচনীয় ভাবে, তখন মহারাষ্ট্রের বুকে এত বড় লাল মিছিল! আশ্চর্য হতেই হয়। কিন্তু বিষয়টা আশ্চর্যজনক নয় একেবারেই। এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল বরং।
কৃষকদের মিছিল-জমায়েত বা বিক্ষোভ মহারাষ্ট্রে প্রথম হচ্ছে, এমন নয়। কখনও রাজস্থান, কখনও মধ্যপ্রদেশ, কখনও হরিয়ানা, কখনও তামিলনাড়ু এই বিক্ষোভ দেখেছে। এমনকী মহারাষ্ট্র তথা মুম্বইও বিপুল কৃষক জমায়েতের সাক্ষী হয়েছে। সর্বত্র সংগঠকরা যে একই ছিলেন, তা নয়। বিভিন্ন সংগঠনের পতাকার তলায় সমবেত হয়েছেন কৃষকরা বিভিন্ন এলাকায়। কিন্তু লক্ষ্যটা সর্বত্র একই।
ক্রমে ক্রমে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে এ দেশের কৃষকের, ক্রমশ আরও প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন তাঁরা। কোথাও ঋণভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন, কোথাও খরার দাপটে হতাশ হয়ে পড়েছেন, কোথাও ফসলের দাম না পেয়ে মাঠেই ফসল নষ্ট করে দিয়েছেন, কোথাও ব্যর্থ মনোরথে আত্মঘাতী হয়েছেন। এমন এক পরিস্থিতি যে দিনের পর দিন চলতে পারে না, সে বলাই বাহুল্য। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশ জু়ড়ে কৃষক যে সংগঠিত হবেনই, তা অত্যন্ত প্রত্যাশিত। মুম্বইয়ে বিরাট কৃষক মিছিল ঢুকতে দেখে কারও মনে হতে পারে, অপ্রত্যাশিত দ্রুততায় সংগঠিত হয়ে গিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু বাস্তবে এই সংগঠিত কৃষক মিছিল খুব অপ্রত্যাশিত নয়। ভারত জুড়েই কৃষকদের পরিস্থিতি এখন যে রকম, তাতে এই ছবিটাই প্রত্যাশিত ছিল।
মহারাষ্ট্রে বামেদের সংগঠন যে অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী তা কিন্তু নয়। রাজ্যে এখন ক্ষমতাসীন বিজেপি-শিবসেনা জোট। প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে অত্যন্ত সবল উপস্থিতি কংগ্রেসের। রয়েছেন কৃষি তালুকের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা শরদ পওয়ার। মহারাষ্ট্রের রাজনীতির এই মূল ধারাগুলির বাইরে বেরিয়ে কৃষকরা দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য বিপুল সংখ্যায় সামিল হলেন বামেদের পতাকার তলায়। এই ছবি চমকে না দিয়ে যায় কোথায়।
কতটা দুর্দশায় রয়েছেন কৃষক, কতটা অবিলম্বে তার পাশে দাঁড়াতে হবে, কতটা তৎপরতার সঙ্গে রাজ্যে রাজ্যে কৃষকের দুর্দশা ঘোচানোর অভিযান শুরু করতে হবে, প্রশাসন তা বুঝতে পারছে কি? মুম্বইয়ে আছড়ে প়ড়া এই বিপুল কৃষক বিক্ষোভকে দেখে আজ চমকে যেতে হচ্ছে। অপ্রত্যাশিত ভাবে কৃষকরা এত সংগঠিত হয়ে উঠেছেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি কৃষকের অবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষ কোনও নীতি না নেয় সরকার, তা হলে অদূর ভবিষ্যতেই আরও অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। প্লাবনের মতো মুম্বইতে ঢুকতে থাকা রক্তাভ মিছিলটাকে দেখে শাসকের বোঝা উচিত দিগন্তে জমে উঠছে রক্তাভ মেঘ। অবিলম্বে উপযুক্ত পদক্ষেপ না করা হলে অর্থাৎ অবিলম্বে কৃষকের সুরাহার পথ খোঁজা শুরু না হলে এই সিদুঁরে মেঘ আরও গাঢ় হবে। গাঢ় সিদুঁরে মেঘ বিপদেরই বার্তাবহ। অপ্রত্যাশিত ভাবে কোনও গভীরতর বিপদ সামনে এসে পড়লে, সামলানো খুব সহজ হবে কি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করে দিক সরকার।
দাবি এক গুচ্ছ।  কৃষকদের সম্পূর্ণ ঋণ মকুব, ফসলের ন্যায্য দাম, লাঙল যার-জমি তার, গরিব কৃষক ও ক্ষেত মজুরদের জন্য পেনশন থেকে আদিবাসীদের অরণ্যের জমির উপরে অধিকারের মতো দাবি। সেই দাবি নিয়েই অসহ্য গরম উপেক্ষা করে ছ’দিন ধরে মিছিল করছেন অসংখ্য কৃষক।
সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই ছুঁয়েছে ৩৫ হাজারে। উদ্যোক্তাদের অবশ্য দাবি, সংখ্যাটা ৩৫ হাজার থেকে পেরিয়ে ৫০ হাজারে গিয়ে পৌঁছেছে। ১৮০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে রবিবার মাঝরাতেই মুম্বই পৌঁছল কৃষকদের সেই লাল মিছিল। নিজেদের দাবি মেটাতে সোমবার সকাল ৯টা থেকেই মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভবন ঘেরাও করবেন কৃষকেরা। তবে তার আগে থেকে শুরু হতে পারে এই মিছিল।
বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে এই কৃষক আন্দোলনকে ঘিরে চিন্তার ভাঁজ শাসক শিবিরের অন্দরে। মহারাষ্ট্রের কৃষক সভার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কৃষক আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন শিবসেনা, এনসিপি-র মতো দল। রবিবার সকালেই কৃষকদের সঙ্গে দেখা করেছেন শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরের ছেলে আদিত্য। নাসিকের এক সভায় কেন্দ্র ও রাজ্যের কৃষক-বিরোধী সরকারকে ছুড়ে ফেলার ডাক দিয়েছেন এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার। আলোচনা শুরু হয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের অন্দরেও। ঘরোয়া আলোচনায় বিজেপি নেতারাও মানছেন যে, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের মতো একের পর এক বিজেপি শাসিত রাজ্যে কৃষক আন্দোলন শুভ সঙ্কেত নয়।
রবিবার সকালে ঠাণে-মুম্বই সীমানা। তার পরে সিয়নের কে জে সোমাইয়া ময়দান। ১৮০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ৩৫ হাজার কৃষকের লাল মিছিল পৌঁছে গেল মুম্বই। মহারাষ্ট্রে সিপিএমের কৃষক সভার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কৃষক-খেতমজুর-আদিবাসীদের আন্দোলনে সামিল হতে ভিড় জমিয়েছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। বিষয়টি নিয়ে সঙ্ঘও সরব হওয়ায় কপালে ভাঁজ বেড়েছে মহারাষ্ট্র ও কেন্দ্রের বিজেপি নেতাদের। আগামিকাল কৃষক নেতাদের বৈঠকে ডেকেছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস।
রবিবার মুম্বইয়ে বিপুল অভ্যর্থনা পেয়েছেন মিছিলে হাঁটা কৃষকেরা। খাবার, জল নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন ছাত্রেরা। কোথাও কোথাও ফুটব্রিজ থেকে ছোড়া হয়েছে ফুল। রাতে আজাদ ময়দানে যাওয়ার কথা বিক্ষোভকারীদের। সোমবার মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভবন ঘেরাও করতে চান আন্দোলনকারীরা। কৃষক সভার সর্বভারতীয় সভাপতি অশোক ধাওলে জানিয়েছেন, মুম্বইবাসীকে অসুবিধেয় ফেলা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। পরীক্ষার্থীদের অসুবিধে যাতে না হয়, সে জন্য সকাল এগারোটার পরে তাঁদের সভা শুরু হবে।
কৃষক নেতৃত্বের দাবি, তাঁদের মিছিলে বিপুল সংখ্যক কৃষক-আদিবাসীর উপস্থিতি সরকারকে নড়ে বসতে বাধ্য করেছে। কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লার বক্তব্য, বিজেপি সরকার ঋণ মকুব নিয়ে হইচই করেছে। কিন্তু কৃষকেরা কেন ঋণ শোধ করতে পারছেন না, তার জবাব খোঁজার চেষ্টা করেনি। কৃষক নেতৃত্বের বক্তব্য, ফসলের ন্যূনতম দাম হিসেবে চাষের খরচের দেড় গুণ অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। কিন্তু চাষের পুরো খরচ কী, তা নিয়ে তিন ধরনের মত রয়েছে। প্রথম মত অনুযায়ী, কেবল চাষ করার খরচ। দ্বিতীয় মত হল, চাষ করা ও কৃষকের পরিবারের অন্যদের শ্রমদানের খরচ। তৃতীয় মত, ওই দুই খরচের সঙ্গে যোগ করতে হবে ভূমিহীন কৃষকের জমি নেওয়ার খরচ। কৃষক নেতাদের মতে, এই তৃতীয় মত অনুযায়ীই চাষের খরচের সংজ্ঞা স্থির করা উচিত। সেই খরচের দেড় গুণ অর্থ পেলে তবেই কৃষকের পক্ষে ঋণের জাল থেকে বেরনো সম্ভব। গত সপ্তাহে চাষের খরচের সংজ্ঞা স্থির করার কাজ শুরু করেছে নীতি আয়োগ। কৃষক আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রও যে নড়েচড়ে বসেছে, এটা তারই প্রমাণ বলে মত রাজনীতিকদের।
বিক্ষোভকারী কৃষকদের সুরে সুর মেলাতে দেখা গিয়েছে অনেক নেতাকেই। ওই আন্দোলনকে সমর্থন করেছে শিবসেনা, এনসিপি-র মতো দল। আজ সকালে কৃষকদের সঙ্গে দেখা করেন শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরের ছেলে আদিত্য।
অন্য দিকে নাসিকের এক সভায় কেন্দ্র ও রাজ্যের কৃষক-বিরোধী সরকারকে ছুড়ে ফেলার ডাক দিয়েছেন এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার। আলোচনা শুরু হয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের অন্দরেও। নাগপুরে এক অনুষ্ঠানে সঙ্ঘ প্রধান ভাইয়াজি জোশী বলেন, ‘‘কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কোনও সরকার উদাসীন থাকতে পারে না।’’
ঘরোয়া আলোচনায় বিজেপি নেতারা মানছেন, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের মতো একের পর এক বিজেপি শাসিত রাজ্যে কৃষক আন্দোলন শুভ সঙ্কেত নয়। আর বামপন্থী নেতাদের একাংশের মতে, কার সঙ্গে জোট হবে, তা নিয়ে বিতর্কে জড়ান সিপিএমের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু সঠিক বিষয় নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুললে যে অনেকেই পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, তা প্রমাণ করেছে মহারাষ্ট্রও। 
কাঁধে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা লাল ঝাণ্ডা নিয়ে কাতারে কাতারে কৃষক হেঁটে আসছেন মুম্বইয়ের দিকে। সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই ৫০ হাজার ছাপিয়ে গিয়েছে। ঋণ মকুব, ফসলের ন্যায্য দাম, লাঙল যার, জমি তার থেকে আদিবাসীদের অরণ্যের জমির উপরে অধিকারের মতো একগুচ্ছ দাবি নিয়ে ৬ মার্চ থেকে পথ হেঁটেছেন ওই কৃষকরা। কলকাতা থেকে দুর্গাপুরের দূরত্ব যতটা, প্রায় ততটা দূরত্ব পায়ে হেঁটে এসে সোমবার তাঁরা ঘেরাও করবেন মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভবন।
ত্রিপুরার ২৫ বছরের দুর্গে ধস নামার পরে এ দেশে বামেরা যখন রীতিমতো কোণঠাসা, তখন বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রেই সিপিএমের কৃষক সভার ডাকে এ হেন আন্দোলন বিজেপি-র ‘গড়’ মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফডণবীসের সরকারকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। সোমবার মুম্বইতে আজাদ ময়দানের কাছেই কৃষকদের পদযাত্রা আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
কিন্তু যে ভাবে চাষিরা কৃষক সভার ঝান্ডা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, তাতে উদ্বিগ্ন বিজেপি নেতৃত্ব। কৃষক সভার মহারাষ্ট্র রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক অজিত নাওয়ালে বলেছেন, ‘‘হেঁটে আসা কৃষকদের সংখ্যাটা ৬০ হাজারও ছাপিয়ে যেতে পারে।’’ কৃষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে মন্ত্রী গিরীশ মহাজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীশ।
বুলেট-ট্রেন-সুপার হাইওয়ের মতো প্রকল্প করে বিজেপি সরকার চমক দিতে চাইছিল। সেই প্রকল্পের নামেই জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় চাষিরা পথে নেমেছেন।
মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফডণবীসের সরকার আগেই ৩৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করে দিয়েছিল। কিন্তু কৃষক সভার যুগ্ম সম্পাদক বিজু কৃষ্ণনের কথায়, ‘‘সরকার এমন সব শর্ত রেখেছে যে ঋণের খুব সামান্য টাকাই মকুব হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘটা করে ফসল বিমা যোজনা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও ক্ষতিপূরণ মিলছে না। বুলেট ট্রেন-সুপার হাইওয়ের নামে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’’
কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লার বক্তব্য, তাঁদের উদ্যোগে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে আন্দোলনে সাফল্য মিলেছে। এ বার মহারাষ্ট্রে আন্দোলনকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে বিরোধী দলগুলি। কৃষক সভার এই বিক্ষোভ সমাবেশকে সমর্থন করেছে মহারাষ্ট্র প্রদেশ কংগ্রেস ও শিবসেনা।
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা।

ই ভি রামস্বামী পেরিয়ার। তাঁর হাত ধরেই আন্নাদুরাই, করুণানিধিদের উত্থান।


সৌজন্য - আনন্দবাজার পত্রিকা, গৌতম চক্রবর্তী, ১১/০৩/২০১৮।

ই ভি রামস্বামী পেরিয়ার। মূর্তি ভাঙা কাকে বলে, জানতেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই আন্নাদুরাই, করুণানিধিদের উত্থান।

সাদা দাড়ি তখন বক্তৃতার মাঝে রীতিমত উত্তেজিত, ‘‘এই তো, আমি নিজে ঠাকুরের মূর্তি ভাঙছি। দেখুন, আমার কিছু হচ্ছে না। হওয়ার কথাও নয়,’’ — সেই জনসমাবেশেই হাতে তুলে পটপট করে মাটির গণেশটি ভেঙে দিলেন তিনি।
ইরোড বেঙ্কট রামস্বামী নাইকার এই ভাবেই আগুনঝরা বক্তৃতা দেন, ‘‘ধরুন, আপনার হাতে একটা লাঠি। হঠাৎ দেখলেন, সামনে দু’টো জিনিস। এক দিকে সাপ, আর এক দিকে এক ব্রাহ্মণ। কাকে আগে মারবেন, বলার দরকার নেই। ব্রাহ্মণ সাপের চেয়েও ধূর্ত, ওকেই আগে নিকেশ করতে হবে।”
তামিলনাড়ুর ইরোড অঞ্চলের সন্তান বেঙ্কট জাতিতে বালিজা বা বৈশ্য। ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। ১৯০৪ সালে কাশীতে বিশ্বনাথ দর্শনে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ২৫। রাস্তায় অজস্র ভিক্ষুক, বিধবা। দাহসংস্কারের বালাই না রেখে মণিকর্ণিকা ঘাটে চিতা থেকে আধপোড়া দেহগুলি টান মেরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেঙ্কটের গা রাগে রিরি করে ওঠে। এক দুপুরে বেশ খিদে, বেঙ্কট গেলেন অন্নসত্রে। সেখানে বিনা পয়সায় খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু অভুক্ত বেঙ্কটকে উঠে আসতে হল। অন্নসত্র শুধুই দরিদ্র ব্রাহ্মণদের জন্য। দোকান থেকে ঝট করে একটা পইতে কিনে ফেললেন বেঙ্কট। তার পর সেই পইতে জড়িয়ে এক মন্দিরে। সেখানেও আছে অন্নসত্র, কিছু দানাপানি অন্তত জুটবে। কিন্তু মন্দিরের প্রহরী তাকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় বের করে দিল। পইতে, উড়ুনি সত্ত্বেও গোঁফই বেঙ্কটকে ধরিয়ে দিয়েছে। তামিল ব্রাহ্মণ আবার গোঁফ রাখে না কি? বেঙ্কট রামস্বামীর এত দিন তাও কিঞ্চিৎ ঈশ্বরবিশ্বাস ছিল, এই ঘটনার পরে তা পুরোদস্তুর চুলোয় গেল।
তামিলনাড়ু বা তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ফেরার পর বেঙ্কটকে একটা প্রস্তাব দিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি। কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব। বেঙ্কটও মনে মনে এমনটাই চাইছিলেন। খাদি, অসহযোগ, মদ্যপান নিবারণ, কংগ্রেসের সব কাজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। সেটা ১৯১৯ সাল। ইরোড শহরে তাঁর বাগিচায় প্রায় ৫০০ তালগাছ ছিল, তা থেকে তাড়ি তৈরি হত। গাঁধীশিষ্য বেঙ্কট সব ক’টা গাছই কেটে দিলেন।
বেঙ্কটের খ্যাতি আরও বাড়ল ত্রিবাঙ্কুর কাণ্ডের পর। ওই দেশীয় রাজ্যটি তখন তামিলনাড়ুর থেকেও ঘোর ব্রাহ্মণ্যবাদী। প্রাসাদের মন্দিরে উৎসব, একটা রাস্তা ‘ইজাভা’বা অব্রাহ্মণদের জন্য সে দিন পুরোপুরি বন্ধ। কংগ্রেস ঘটনাটা হাতে নিল, বেঙ্কট সেখানে নেতৃত্ব দিতে হাজির। বক্তৃতা, জেল। তাঁকে ত্রিবাঙ্কুর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হল। সত্যাগ্রহী সেই নির্দেশও মানলেন না। শেষ অবধি রাজপ্রাসাদ নতি স্বীকার করল। অব্রাহ্মণদের জন্য খুলে দেওয়া হল মন্দিরের দরজা।
ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধিতা তাঁর সারা জীবনে। তিরুনালভেলির কাছে গাঁধী-শিষ্যরা এক গুরুকুল আশ্রম চালাতেন। জানা গেল, সেখানে ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ ছাত্রদের খাওয়ার বন্দোবস্ত আলাদা। বেঙ্কট ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ওই গুরুকুলকে তামিলনাড়ু কংগ্রেস ১০ হাজার টাকা দান করবে কথা দিয়েছিল। কং‌গ্রেসের তৎকালীন সম্পাদক হিসেবে বেঙ্কট টাকা আটকে রাখলেন। কিন্তু যুগ্ম সম্পাদক ব্রাহ্মণ, তিনি টাকাটা ছেড়ে দিলেন। গাঁধীর দলের সঙ্গে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন হল বেঙ্কটের। চলে এলেন উলটো দিকে, জাস্টিস পার্টিতে। উত্তর ভারতও কি কম জাতিদ্বেষী? ত্রিবাঙ্কুরে অব্রাহ্মণদের জন্য মন্দিরের দরজা খোলার সাফল্যমণ্ডিত আন্দোলন ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’কাগজেও ছেপে বেরিয়েছিল, সেখানে বেঙ্কটের উল্লেখ ছিল না।
বেঙ্কটকে এখন অবশ্য সবাই অন্য নামে চেনে। নিজের জাতি-পরিচয় ‘নাইকার’ আর লেখেন না তিনি। সবাই পেরিয়ার নামেই তাঁকে চেনে। ‘দেখান, ব্রাহ্মণদের প্রতি আপনাদের ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের হোটেলে খেতে যাবেন না। ওদের নির্বাসন দিন।’
এত উত্তপ্ত বক্তৃতা, কিন্তু ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে মারধর চলত না। শুধু তুতিকোরিনে কিছু গুন্ডা এক বার কিছু ব্রাহ্মণের টিকি কেটে, পইতে ছিঁড়ে দিয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পেরিয়ারের নাস্তিকতা আসলে জাতিভেদ-প্রথা ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ। মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্টাল স্টাডিজ-এর সমাজবিজ্ঞানী এ আর বেঙ্কটচলপতি এক বার বলেছিলেন, ‘‘নাস্তিকতাকে পেরিয়ারের মূল বক্তব্য ভাবলে ভুল করবেন। তামিলনাড়ুর সমাজে তখন নবজাগরণ ঘটেনি। ব্রাহ্মণরা সংখ্যায় অল্প, কিন্তু জাতিভেদের সুযোগ নিয়ে ছড়ি ঘোরাত। চাকরিবাকরি বেশির ভাগ ওঁদেরই হাতে। পেরিয়ার এই সমাজটার গণতন্ত্রীকরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন।”
পেরিয়ার কখনও তাঁর শ্রোতাদের মন্দিরে গিয়ে বিগ্রহ দুরমুশ করার ডাক দেননি। তাঁদের পরিবার ইরোডে এক মন্দিরের ট্রাস্টি ছিল। সেখানে এক দিনের জন্যও পুজো বন্ধ হয়নি। পরিষ্কার বলেছিলেন, তফসিলি জাতি, জনজাতি ও দলিতরাও অব্রাহ্মণদের সঙ্গে সমান অধিকার পাবে। অম্বেডকরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বন্ধুত্বের। এমনকী, রাজাগোপালাচারির সঙ্গেও। দু’জনে ভিন্ন দলে, কিন্তু শ্রদ্ধা অটুট। রাজাগোপালাচারি তখন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে নালিশ করা হল, পেরিয়ার রাস্তায় বিগ্রহ ভেঙে লোক খেপাচ্ছেন। রাজাগোপালাচারি বলেছিলেন, ‘‘সে তো আলওয়ার সাধুরাও ভাঙতেন।” দক্ষিণ ভারতে একদা বৈষ্ণব আলওয়ার বনাম শৈব লিঙ্গায়েতদের মধ্যে ঝামেলা লেগেই থাকত। রাজাগোপালাচারির ইঙ্গিত সে দিকেই।
নাস্তিকতার পাশাপাশিই তিনি এনেছিলেন তামিল স্বাভিমান। গীতা বা রামায়ণ-মহাভারত নয়, চোল রাজত্বের সেকুলার কবিতা ‘তিরুক্কুরাল’ই দ্রাবিড় গর্বের প্রতীক তাঁর কাছে। এক ভক্ত এক বার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘‘গীতার বিরুদ্ধে কী বলবেন? বলছে এক গোপালক, শুনছে ক্ষত্রিয়। সেটা ব্যাসদেব নামে যে লিখছে, ধীবর রমণীর সন্তান।” পেরিয়ারের উত্তর, ‘‘আমি তোমার মতো পড়ুয়াদের কথা বলছি না। পুরো সমাজটাকে জাগাতে চাইছি।”
মেয়েদের বলেছিলেন, ‘‘বিয়ের সময় স্বামী আপনাকে যে থালি (মঙ্গলসূত্র) পরিয়ে দেন, সেটিও দাসত্বের প্রতীক।”
একটা সময় রাজনীতি ছেড়ে পুরোদস্তুর সামাজিক কাজে, কিন্তু পেরিয়ারের শিষ্য আন্নাদুরাই, করুণানিধি, এম জি রামচন্দ্রনরাই তামিল রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। স্বাধীন মেয়ের কথা না বললে কন্নড় ব্রাহ্মণ জয়ললিতাই বা কী ভাবে উঠে আসতেন তামিল জনসমাজে?
আজকের কালাপাহাড়দের সীমাবদ্ধতা এখানেই। পেরিয়ারের রাজনৈতিক দর্শন যে আলাদা, তাঁরা খেয়াল করেন না। তাঁদের কাছে পেরিয়ার থেকে লেনিন, সবাই পবিত্র দেবমূর্তি। এক পোঁচ রং চাপিয়ে, যেন-তেন-প্রকারেণ ভেঙে দিলেই হল! এই গর্বান্ধতাই আশু বিপদ।

Saturday, March 10, 2018

বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে মহারাষ্ট্রে আদিবাসী ও কৃষকদের মহামিছিল।

মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে ৬ মার্চ যখন কৃষকদের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখনই মিছিলে চাষিদের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার। এখন তা ৩০ হাজারে ছাপিয়ে গিয়েছে। সকলের কাঁধেই হাজারে হাজারে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা লাল ঝাণ্ডা উড়ছে। প্রায় ২০০ কিলোমিটার হেঁটে কৃষকেরা যখন রবিবার মুম্বইয়ে পৌঁছবেন, সংখ্যাটা তখন ৫০ হাজারে পৌঁছে যাবে বলে অনুমান। ঋণ মকুব, ফসলের ন্যায্য দাম, লাঙল যার, জমি তার থেকে আদিবাসীদের অরণ্যের জমির উপরে অধিকারের মতো একগুচ্ছ দাবি নিয়ে সোমবার মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভবন ঘেরাও করবেন কৃষকরা।
পশ্চিমবঙ্গ বা কেরল নয়। ত্রিপুরার দুর্গে ধস নামার পরে এ দেশে বামেরা কোণঠাসা। তখন বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রেই সিপিএমের কৃষক সভা এ হেন আন্দোলন খাড়া করে ফেলেছে।
টনক নড়েছে মহারাষ্ট্র সরকারের। সোমবার মুম্বইতে আজাদ ময়দানের কাছেই কৃষকদের পদযাত্রা আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। কিন্তু যে ভাবে চাষিরা কৃষক সভার ঝান্ডা হাতে রাস্তায় নেমেছেন, তাতে উদ্বিগ্ন বিজেপি নেতৃত্ব। বুলেট-ট্রেন-সুপার হাইওয়ের মতো প্রকল্প করে বিজেপি সরকার চমক দিতে চাইছিল। সেই প্রকল্পের নামেই জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় চাষিরা পথে নেমেছেন। মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফডণবীসের সরকার আগেই ৩৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করে দিয়েছিল। কিন্তু কৃষক সভার যুগ্ম সম্পাদক বিজু কৃষ্ণনের যুক্তি, ‘‘সরকার এমন সব শর্ত রেখেছে যে ঋণের খুব সামান্য টাকাই মকুব হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘটা করে ফসল বিমা যোজনা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও ক্ষতিপূরণ মিলছে না। বুলেট ট্রেন-সুপার হাইওয়ের নামে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”

আদিবাসী ও কৃষকদের দাবিদাওয়া কী কী
• কৃষকদের সম্পূর্ণ ঋণ মকুব
• ফসলের ন্যূনতম দাম হবে চাষের পুরো খরচের দেড় গুণ
• অরণ্যের অধিকার আইনের রূপায়ণ
• নদী সংযুক্তি প্রস্তাব বাতিল করে আদিবাসীদের জমি রক্ষা
• খরা কবলিত এলাকায় জলের বন্দোবস্ত
• আদিবাসী-চাষিদের জমি দখল বন্ধ করা
• লাঙল যার, জমি তার
• গরিব কৃষক ও ক্ষেত মজুরদের জন্য পেনশন
• পোকামাকড় ও শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতিপূরণ

কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লা করিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের উদ্যোগে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে আন্দোলনে সাফল্য মিলেছে। এ বার মহারাষ্ট্রে আন্দোলনকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে বিরোধী দলগুলি।
কিন্তু এই আন্দোলন থেকে কি সিপিএম ভোটে ফায়দা তুলতে পারবে? বিজু কৃষ্ণনের জবাব, ‘‘আমরা ভালো ফল করব কি না জানি না। কিন্তু বিজেপির হারের পথ যে মসৃণ করা যাবে, সেটা নিশ্চিত।”
সৌজন্য – আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১/০৩/২০১৮।

Wednesday, March 7, 2018

ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে (২০১৮) আদিবাসী রাজনৈতিক দল IPFTএর সাফল্য।



ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে (২০১৮) আদিবাসী নেতা নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা ও আদিবাসী রাজনৈতিক দল ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা (Indigeneous Peoples Front of Tripura -IPFT)এর সাফল্য।  

দেশের আর সর্বত্র বিজেপি যে হিন্দু তাস খেলে বা ভারতীয়ত্বের জিগির তোলে, ত্রিপুরায় তারা সে ভাবে তা তোলেনি। আর তুললেও অত্যন্ত নিচু পর্দায় রেখেছে। এর কারণ কী? বিভিন্ন মহলে কথা বলে এর বিভিন্ন কারণ উঠে আসছে।
এ বারের ত্রিপুরা জয়ের জন্য বিজেপির পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। হিন্দু-মুসলমান অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ এখানে নেই। বিজেপি জানত, আদিবাসী এলাকাই হল সিপিএমের সবথেকে শক্তিশালী ভিত। অতএব, প্রথম আঘাত হানতে হবে সেখানেই। ত্রিপুরা বিধানসভার মোট ৬০টি আসনের মধ্যে আদিবাসী তথা তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে ২০টি আসন। আরও ১০টি আসন রয়েছে তফসিলি জাতির জন্য। আদিবাসী এলাকা দখলের জন্য সহযোগী হিসেবে বিজেপির প্রয়োজন ছিল এমন কোনও দলকে যারা কার্যকরী ভাবে সিপিএমকে টক্কর দিতে পারবে। ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়েছিল আদিবাসীদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল ইন্ডিজেনাস পিপল’স ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (আইপিএফটি)। পরে ২০০৭-এ সেটির পুনরুজ্জীবন ঘটান নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, যিনি ‘এন সি’ নামেও পরিচিত। আদিবাসীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট প্রভাবও রয়েছে। সেই আইপিএফটি-কে নিয়ে বিজেপি আদিবাসী এলাকা দখলে ঘুঁটি সাজায়। আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দিয়ে বিজেপি এই সংগঠনকে নিয়ে যায় একেবারে বুথস্তর পর্যন্ত। কারণ বিজেপি জানত, স্বশাসিত জেলা পরিষদ (অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল) এলাকায় সিপিএমের সংগঠন অত্যন্ত পোক্ত। তিন-তিন বার এডিসি-র নির্বাচনে সব ক’টি আসনই দখল করেছে সিপিএম।
আদিবাসীদের তোলা পৃথক ‘টিপরাল্যান্ড’-এর দাবি না মানলেও বিজেপি তাদের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। বিজেপির এই পরিকল্পনা যে অত্যন্ত সফল হয়েছে তার প্রমাণ, এ বার যে ন’টি আসনে আইপিএফটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, তার মধ্যে আটটি আসনেই তারা জয়ী হয়েছে। সিপিএম তাদের কোনও ভাবেই আটকাতে পারেনি। নিজেদের শক্ত ঘাঁটি, আদিবাসী এলাকাতেই এ ভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না সিপিএমের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা মনে করছেন, পাহাড়ে আদিবাসী এলাকায় সংগঠন যে একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে তা এলাকার নেতা-কর্মীরা বুঝতে পারলেন না কেন? কেন বুথস্তর থেকে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে খবর পৌঁছল না যে, বড় রকমের ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে? বস্তুত, সিপিএম নেতাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, তাঁদের দলীয় সংগঠন এতটাই পোক্ত যে সেখানে কেউ ছুঁচও ফোটাতে পারবে না!
যদিও একেবারে কেউই এ কথা বোঝেননি তা নয়। যেমন, নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত সিমনা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী প্রণব দেববর্মা বলেছিলেন, ‘‘আদিবাসীদের বোঝানোটা খুব কঠিন। কারণ, পৃথক রাজ্যের দাবিটা তাঁদের কাছে ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ বিষয়। তাঁদের খুব সাবধানে বোঝাতে হচ্ছে কেন আলাদা রাজ্য পেলেও ভাল হবে না। আর তা কী করেই বা সম্ভব? আমাদের কাজটা এ বার খুব কঠিন।’’
আর সেখানেই আইপিএফটি প্রার্থী বৃষকেতু দেববর্মা আঙুল তুলে রাস্তা দেখিয়ে বলেছিলেন, রাস্তার হাল দেখুন। স্বাস্থ্যের হাল দেখুন, শিল্প খুঁজতে দূরবীন লাগবে! এর নাম উন্নয়ন?’’ তিনি না হয় বিরোধী প্রার্থী। এমন অভিযোগ তুলতেই পারেন। কিন্তু বিভিন্ন আদিবাসী এলাকায় এই প্রশ্ন ছিল সাধারণ মানুষেরও। এই প্রশ্ন সিপিএম নেতৃত্বের কান পর্যন্ত পৌঁছয়নি, এটা মেনে নিলে বুঝতে হয়, সিপিএমের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গৌতম দাশ স্বীকার করে নিলেন, ‘‘সংরক্ষিত আসনগুলিতে ফল অত্যন্ত খারাপ হয়েছে। মেজর সেটব্যাক। আমাদের এর কারণ গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।’’
অথচ ত্রিপুরার ইতিহাস বলছে, আদিবাসী এলাকায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের বড় সাথী ছিলেন এখানকার আদিবাসী মানুষেরা। তাঁরা না থাকলে বামপন্থী আন্দোলন ত্রিপুরায় দানা বাঁধতে পারত না। এর সব থেকে বড় প্রমাণ দশরথ দেব। তাঁকে বলা হত আদিবাসীদের ‘মুকুটহীন সম্রাট’। ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরে আদিবাসীদের জন্য সম্পূর্ণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু এর ফ‌লে ধীরে ধীরে আর এক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। আগরতলার মহারাজা বীরবিক্রম কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক মিহির দেব বলছেন, ‘‘ওই সংরক্ষণের ফলে আদিবাসীদের মধ্যে এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। তাদের একাংশ পড়াশোনা করে, চাকরিও পায়। সেটা ভাল দিক। কিন্তু আর যারা সে সুযোগ পায়নি তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। যেটাকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বলা চলে।’’
এরই পাশাপাশি মিহিরবাবু বলেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকার আদিবাসীদের জন্য প্রচুর কিছু করেওছে। যেমন, মধ্যবিত্ত বাঙালিদের জন্যও করেছে। কিন্তু কোথাও একটা বিশ্বাসঘাতকতাও লুকিয়ে রয়েছে। হয়তো যাদের দেখে সিপিএম-মুখ মনে হয়েছে, তাদের হাতটা আসলে বিজেপি। এটা ধরতে পারাটা দরকার ছিল।’’
ইতিহাসবিদরা বলছেন, এই ত্রিপুরার পাহাড়েই এক সময় তীব্র জনশিক্ষা আন্দোলন হয়েছে। আদিবাসীদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দাবিতে সেই আন্দোলনে অগ্রণী ছিলেন দশরথ দেব, হেমন্ত দেববর্মা, বিদ্যা দেববর্মা, সুধন্য দেববর্মা-সহ অনেকেই। সেই আন্দোলন দমন করতে নামাতে হয় সেনাবাহিনী। সেই পাহাড়েই এখন প্রায় সাড়ে চারশো স্কুল হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসও তো পাল্টে যায়। পাল্টাতে থাকে। পরিস্থিতি আর প্রয়োজনভিত্তিক ইতিহাস ভারতীয় রাজনীতির প্রয়োজনে বহু বারই পরিবর্তিত হয়েছে। হচ্ছেও।
নির্বাচনে সাফল্য পাবার পর নতুন করে পৃথক রাজ্যের দাবি তুলল বিজেপির নির্বাচনী সহযোগী ইন্ডিজেনাস পিপল’স ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা (আইপিএফটি)। তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারকে এ ব্যাপারে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে। সব দিক খতিয়ে দেখে সেই কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আইপিএফটি-র সভাপতি নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা সোজাসুজিই এই দাবির কথা জানালেন। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচনী প্রচার পর্বে বিজেপি আগাগোড়া বলে গিয়েছে, তারা রাজ্য ভাগের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ থেকে শুরু করে দলীয় নেতৃত্ব প্রচারে কখনও আদিবাসীদের এই দাবিকে মান্যতা দেননি।
বিদায়ী শাসক দল সিপিএম বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে, বিজেপি রাজ্যভাগে মদত দিচ্ছে। আইপিএফটি-র মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সঙ্গে জোট করে তারা রাজ্য ভাগের চক্রান্ত করছে। এর ফলে বাঙালিদের সঙ্গে আদিবাসীদের বিরোধ বাঁধবে।
আইপিএফটি-র নেতা নরেন্দ্র চন্দ্র (এন সি) দেববর্মা বলছেন, ‘‘নির্বাচনের আগে এ ব্যাপারে কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। জোটের শর্ত মেনেই এই দাবি প্রচারে তোলা হয়নি।’’ পাশাপাশি, তাঁর বক্তব্য, ‘‘২০০৯ থেকে আমরা দাবি তুলি, সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী এখানে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠন করা হলেও আদিবাসীরা তাদের আর্থ-সামাজিক, সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি থেকে এখনও ৯০ শতাংশ বঞ্চিত থেকে গিয়েছে। সে জন্যই তাদের হাতে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা অর্পণের প্রয়োজন। তা করতে গেলে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ক্ষমতাও অর্পণ করতে হবে। এই অর্পণ তখনই সম্ভব যখন পূর্ণাঙ্গ এক ভৌগোলিক এলাকাতে ওই জনসমষ্টির জন্য পূর্ণাঙ্গ একটা রাজ্য করে দেওয়া হয়।’’ এন সি দেববর্মার সাফ কথা: ‘‘ষষ্ঠ তফসিল এলাকার থেকে উন্নীত করে ‘টিপ্রাল্যান্ড’ হোক— এই দাবি আমরা করছি।’’ এন সি দেববর্মার দাবি, এ কথা তাদের জোটসঙ্গী বিজেপিও তাদের এই দাবীর কথা জানতেন। যদিও ত্রিপুরার ভারপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘‘উনি যদি আলাদা রাজ্যের দাবি করেন করবেন। কিন্তু আমাদের যে পরিকল্পনা আছে, যে ইচ্ছা আছে তা হল ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। আমরা এই দাবির সঙ্গে সহমত নই।’’ তবে, এরই পাশাপাশি সুনীল বলেন, ‘‘আমি এটা খতিয়ে দেখব যে আলাদা রাজ্য চাওয়ার কারণটা কী? আসলে, সিপিএম ২৫ বছর ধরে এখানে ছিল। তারা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে রেখেছিল। আমরা আদিবাসীদের সম্মান রক্ষা করব।’’ আগরতলা শহরের কর্নেল চৌমোহনীর কাছে নিজের বাড়িতে বসে এন সি দেববর্মা বললেন, ‘‘এই দাবি নির্বাচনোত্তর নয়। হঠাৎ করেও আমরা এই দাবি তুলিনি। ২০০৯ সাল থেকেই লাগাতার এই দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছি।’’ আইপিএফটি প্রধান অবশ্য অকপটেই বলেছেন, নির্বাচনের আগে সোচ্চারে পৃথক রাজ্যের দাবি না তোলাটা একটা ‘স্ট্র্যাটেজি’ ছিল। এত দিন বামফ্রন্ট দাবি করে এসেছে, ত্রিপুরায় বাঙালি ও আদিবাসীদের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আছে। তাদের নিজেদের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। টাকারজলা সংরক্ষিত কেন্দ্রে এ বার সিপিএম প্রার্থীর থেকে ১২ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী এন সি দেববর্মা বলছেন, ‘‘বাঙালি-আদিবাসী আগে যেমন পাশাপাশি ছিল, এখনও তেমনই থাকবে। এর সঙ্গে আলাদা রাজ্য গঠনের কোনও সম্পর্ক নেই। এ সব কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বলা হচ্ছে।’’
এই নির্বাচনে ন’টি আসনে প্রার্থী দিয়ে আটটিতেই জয়লাভ করেছে আইপিএফটি। রাজ্যের আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত যে ১৯টি আসনে ভোট হয়েছে, তার মধ্যে বিজেপি-আইপিএফটি জোট জয়ী হয়েছে ১৭টিতেই। এ ছাড়া পশ্চিম ত্রিপুরার চড়িলাম (সংরক্ষিত) আসনের সিপিএম প্রার্থী রমেন্দ্র নারায়ণ দেববর্মার মৃত্যু হওয়ায় ওই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়ে গিয়েছে। এই সাফল্যের জন্যই সুর আরও একটু চড়িয়ে এন সি দেববর্মা দাবি করেছেন, আদিবাসীদের মধ্য থেকেই মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে।
রাজ্যের আদিবাসী তথা তপসিলি উপজাতি সংরক্ষিত ২০টি আসনের মধ্যে ১৯টি ছিল যাদের দখলে, সেই বামেদের ঝুলিতে এ বার মাত্র দুই! আর বিজেপি-আইপিএফটি জোট জিতে নিয়েছে ১৭টি আসন। তার মধ্যে আইপিএফটি ৯টি আসনে লড়়ে ৮টিতেই জয়ী! আদিবাসী এলাকার স্বশাসিত জেলা পরিষদের (এডিসি) ২৮টি আসনই যাদের হাতে, সেই বামেরা এমন বিপর্যয়ে স্বভাবতই বিহ্বল। আবার জিতেও খুব স্বস্তিতে নেই বিজেপি। কারণ, আইপিএফটি সভাপতি এন সি দেববর্মা টাকারজলায় রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধানে (১২,৬৫২) জিতে জানিয়ে দিয়েছেন, পৃথক তিপ্রাল্যান্ডের দাবিতে তাঁদের আন্দোলন চলবে! ভোটের আগেও এই মর্মেই তাঁদের প্রচার ছিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিজেপি-র সরকার চালানোর সঙ্কট নেই ঠিকই। কিন্তু বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো রাজ্য ভাগের দাবি সামাল দিতে হবে তাদের!
আদিবাসী নেতা এন সি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘‘সরকারে যোগ দেওয়ার সঙ্গে আন্দোলন বন্ধ করার তো কোনও সম্পর্ক নেই! বিজেপি হাইকম্যান্ডের দুই প্রতিনিধি কাল এলে তাঁদের কাছে আমাদের প্রস্তাব জানিয়ে দেব। প্রথমত, পৃথক রাজ্যের দাবি বিবেচনা করতে কেন্দ্রের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি দ্রুত গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উত্তর-পূর্বের বহু রাজ্যের প্রথা মেনে আদিবাসী জনগোষ্ঠী থেকেই কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে।’’
পৃথক রাজ্য নিয়ে এখনকার টানাপড়়েনের সঙ্গে অনেকে বাংলায় গোর্খাল্যান্ড সংক্রান্ত পরিস্থিতির মিল পাচ্ছেন। সেখানে পরিবর্তনের সময়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে পাশে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে বিমল গুরুঙ্গেরা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে হুঙ্কার শুরু করতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাধে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কৌশলে গুরুঙ্গদের কোণঠাসা করে মোর্চার মধ্যে থেকে বিনয় তামাঙ্গদের কাছে টেনেছেন। ত্রিপুরায় বিজেপি-কেও কৌশলেই আইপিএফটি-র মোকাবিলা করতে হবে।
বিজেপি-র পর্যবেক্ষক সুনীল দেওধরের বক্তব্য, ‘‘আলাদা রাজ্যের দাবি মানব, আমরা কখনও বলিনি। দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলবে।’’ তবে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুব্রত চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘আমাদের এখানে একটা কথা আছে, কামান চাইলে বন্দুক মিলবে! আইপিএফটি এ সব করে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদ আদায় করতে চাইছে।’’
বাঙালি ও আদিবাসী মিলিয়ে লাখখানেক নতুন ভোটারদের সমর্থন যে তাঁরা পাননি, বুঝতে পারছেন সিপিএম নেতৃত্ব। আদিবাসী যুবকদের হাতে স্মার্টফোন রাখার মতো আর্থিক সঙ্গতি অনেক বছরের চেষ্টায় অর্জন করা গিয়েছিল। সেই স্মার্টফোনেই ‘চলো পাল্টাই’য়ের স্রোত ঢুকে কখন যে পৃথক রাজ্যের আবেগে মগজ ধোলাই হয়ে গিয়েছে, তা-ও সুব্রতবাবুরা টের পাননি!
কৃতজ্ঞতা স্বীকার – আনন্দবাজার পত্রিকা।