Thursday, February 1, 2018

কবি, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও আদর্শ শিক্ষক সারদা প্রসাদ কিস্কু।

ইংরাজী ১৯৫২ সালে পাহাড়িয়া সেবা মন্ডল বার্ষিক রিপোর্টে এই কথা বলা হয় যে, "মানভূম জেলায় শ্রী সারদা প্রসাদ কিস্কু 'ভুরকাঃ ইপিল' কবিতা পুস্তক লিখিয়া সাঁওতালি ভাষার এক নতুন জিনিষ দিয়েছেন এবং প্রমান করিলেন যে সাঁওতালি ভাষায় মৌলিক উপায়েও উচ্চ স্তরের ভাবপূর্ণ কবিতা লেখা যাইতে পারে। ইহা অন্যান্য কবিগনকে প্রেরনা যোগাইবে"। Bulletin of Cultural Research Institution, Santal Song, different types by S.S.Bhattacharya বলেছেন - Most Powerful Poet in the Language (Santali)
কবি, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও আদর্শ শিক্ষক সারদা প্রসাদ কিস্কুর জন্ম  ১৯২৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী। পুরুলিয়া জেলার দাঁড়িকাডোবা (ভালুকবাসা) গ্রামে। পিতা- চরন কিস্কু। খুব গরীব ছিলেন। চরন বাবুর চার কন্যা। আর এক মাত্র পুত্র - সারদা প্রসাদ। ১৯৩৮ সালে জোরোবাড়ি নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ি। পরবর্তীকালে বড়গেড়িয়া উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে কৃতকার্য হন ১৯৪০ সালে। পরে বাঁকুড়া জেলার রানীবাঁধ মিডিল স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪৩ সালে মেরিট স্কলারশিপ পান। রানীবাঁধ স্কুল থেকে পাশ করার পর খাতড়া হাই ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪৮ সালে সেখান থেকে  ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর রামানন্দ কলেজে আই.এস.সি. তে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু খরচের অভাবে অল্প দিনের মধ্যে লেখা পড়ায় ইতি টানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৫০ সালে বান্দোয়ান হিন্দি শিক্ষন কেন্দ্রে  ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং ছিল তিন মাসের। হঠাৎই  জামতোড়িয়া  সিনিয়র বেসিক স্কুলে শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত জামতোড়িয়া স্কুলেই শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালে  বান্দোয়ান বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে ভোটে প্রার্থী হয়েছিলেন কিন্তু লোক সেবক সংঘের প্রার্থী ক্ষুদিরাম মাঝির কাছে পরাজিত হন। জিততে না পারার জন্য আবার শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন সিংরাইডি গ্রামে। পরে  নিজের বাড়ীর কাছেই বড়দিহি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। সেখান থেকেই ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে অবসর গ্রহন করেন। আদর্শ শিক্ষক হিসাবে ১৯৭৩ সালে রাজধানী দিল্লী তে রাষ্ট্রপতি ভি.ভি.গিরির হাত থেকে আদর্শ শিক্ষকের পুরস্কার নেন।
কবি কিস্কু যৌবনে সুন্দর গান করতেন এবং মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাতে পারতেন। যেখানেই যেতেন গানের খাতা সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কবি কিস্কুর কবিতা-য় একটা নতুন বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। সমস্ত কবিতার ছন্দের গাবান খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর প্রথম কবিতার বই - "ভুরকাঃ ইপিল"। এটা ১৯৫৩ সালে সাঁওতাল পাহাড়িয়া সেবা মন্ডল, দেওঘর থেকে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বই - "কুহু বাউ" (১৯৬০)। আর তৃতীয় বই "গাম গাঁদার" (১৯৬৭) প্রকাশিত হয়। সমস্ত গান, কবিতায় পাওয়া যায় কল্পনা জগতের সমস্ত কিছুই। পাওয়া যায়  পৃথিবীর  মানুষ, পশু,পাখী, গাছ গাছালির খুব গভীরের কথা। সাঁওতালি ভাষা সাহিত্যের উপর এত বেশি প্রেম ও উদ্যোগ খুব কম জনের মধ্যে পাওয়া যায়।
১৩৭৭ সালের ১৩ই কার্ত্তিক অর্ধ সাপ্তাহিক আনন্দবাজার পত্রিকায় অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, "সাঁওতাল নবজাগৃতি শ্রীসারদা প্রসাদ কিস্কু আধুনিক সাঁওতালির সর্বাপেক্ষা প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন কবি।", 'হড় সম্বাদ' পত্রিকার সম্পাদক ডমন সাহু 'সমীর' বলেছিলেন - Up To Bottom কবি উনি। মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, “কবি সারদা প্রসাদ মস্ত বড় মাপের মানুষ, শ্রদ্ধা করি  তাঁকে”। কবি কিস্কুর মৃত্যুর পর মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন – “আমার কাছে বড় এটা বনস্পতির মৃত্যু”।
সারদা বাবু কবি হিসাবে নিশ্চয় বড় ছিলেন। কিন্তু দায়িত্ববান, বিবেকী, নির্ভীক, এ সব বিচারে তিনি মানুষ হিসাবে আরও বড় ছিলেন। বহুমাত্রিক ব্যাক্তিত্ব  ছিলেন তিনি। বড় বড় ঘা খাওয়া সারদাবাবুর জীবনে নিত্য  সঙ্গী ছিল। কিন্তু তিনি এমন লোক ছিলেন যিনি নিজের স্বার্থের কথা বলতে পারতেন না। অত্যন্ত প্রখর ছিল তাঁর আত্মসম্মানবোধ। সারদা বাবু শুরুতে প্রকৃতির কবি ছিলেন। পরবর্তীকালে দুঃখের কবি। শেষকালে বিপ্লবী কবি। জীবনে অনেক গান লিখে গেছেন। তিনি শিশু সাহিত্য "গিদরা বাউলি" ও বেশ কিছু লিখেছেন। বাংলাতেও খুব সুন্দর প্রবন্ধ লিখতে পারতেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রত্রিকাতেও লিখেছেন। সমাজের অনেক সমস্যা তুলে ধরতেন। অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর অসীম শক্তি ছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা সাঁওতালিতে অনুবাদ করেন। কবি কিস্কু বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, সংঘের সংঘে যুক্ত থেকে সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রেখে সাঁওতাল জাতিকে উন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন সারা জীবন। তিনি ছিলেন "সুসার গাঁওতা" পুরুলিয়ার সভাপতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকাররের Santali Language Committee (সাঁওতালি ভাষা কমিটি)-র সদস্য। পুরুলিয়া সান্তালি লিটারেরী সোসাইটির সভাপতি। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিবিল লিবার্টিজ (Peoples Union for Civil Liberties), পুরুলিয়া শাখার সভাপতি। খেরওয়াল গাঁওতা, জামতোড়িয়ার সভাপতি। খেরওয়াল আড়াং (১৯৫৭-৫৮) ও সুসার ডাহার (১৯৭২-৭৩) পত্রিকার সম্পাদক। কবি কিস্কুর রচিত ও প্রকাশিত বইপত্র - (১) ভুরকাঃ ইপিল (১৯৫৩), (২) কুহু বাউ (১৯৬০),   (৩) গাম গঁদার (১৯৬৭) (৪), লাহাঃ হররে (১৯৮৫), (৫)সলম লটম (কাহিনী) (১৯৮৮), ( ৬) জুডাসি অনল মালা (১৯৯৪), (৭) বিদাঃ বেড়া (১৯৯৭) (৮) সঙ্গীতিকা (১৯৯৮)। ইত্যাদি।  
কবি, আদর্শ শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক সারদা প্রসাদ কিস্কুকে তাঁর অবদান ও মহত্বের জন্য বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন তাঁকে সম্বর্ধনা, স্মারকপত্র, পুরস্কার প্রদান করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে আদর্শ শিক্ষক হিসাবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭৪ সালে  কলকাতার "আবওয়াঃ গাঁওতা" কর্তৃক আদর্শ শিক্ষক হিসাবে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। ঐ গাঁওতা কর্তৃক ১৯৬৩ সালে স্মারকপত্র (সারহাও সাকাম)  প্রদান। ১৯৭৩ সালে ভারতীয় সাহিত্য সংঘ, দেওঘর, বিহার কর্তৃক মানপত্র প্রদান। মহারাজনগর আদিবাসী ক্লাব, সেনেড়া, পুরুলিয়া কর্তৃক ১৯৮১ সালে মানপত্র প্রদান। ১৯৮২ সালে বিক্রমশীলা হিন্দি বিদ্যাপীঠ কর্তৃক কবিরত্ন প্রদান। সাঁওতালি রাইটার্স রিসেপসন কমিটি, সাঁতরাগাছি, হাওড়া কর্তৃক হিহিড়ি পিপিড়ি প্রদান। ১৯৮৬-৮৭ সালে বিহার সরকার, রাজভাষা বিভাগ কর্তৃক জনজাতীয় পুরস্কার ঘোষনা করা হয়। ১৯৮৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে গুণীজন সম্বধর্নায় তাম্রপত্র তাপ্রদান করা হয়। ২৬ শে সেপ্টম্বর ১৯৯২ তারিখে আদর্শ শিক্ষক, ডাইনী বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা সাহিত্যে অবদানের জন্য স্মারক প্রদান করা হয়। সানতালি সাহিত্য পরিষদ, করহড়বিল, দুমকা থেকে "গুরু গমকে সারহাও" প্রদান করা হয়। কবি কিস্কু আদিবাসী সাঁওতাল সমাজ কে এক উচ্চ স্তরে তুলে দিয়ে, সাঁওতালি সাহিত্য সম্ভার সমৃদ্ধ করে ১৯৯৬ সালের ১৮ ই মার্চ বাংলা-১৪০২ সালের ৪ঠা  চৈত্র সুন্দর এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর বিদায় কালে মহাশ্বেতা দেবী দেশবাসীকে স্মরন করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- "বিজ্ঞানের ও মানবতার স্বপক্ষে প্রতিটি সংগ্রামী পদক্ষেপ হবে সারদা প্রসাদের মরণোত্তর স্বীকৃতি। সারদা প্রসাদ কিস্কুর জীবনী স্কুল পাঠ্যে অন্তর্ভূক্ত হবে না কেন ? মানুষ ছিলেন তিনি, আমরা পিগমিয়।" মহাশ্বেতা দেবী বেঁচে থাকতে জেনেছেন কিনা জানা নেই - তাঁর অনেক লেখা ঝাড়খন্ডের রাঁচী, ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.এ., বি.এ. ক্লাসের সিলেবাসে স্থান পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতালি সিলেবাসে জায়গা হয়েছে। পশ্চিম বঙ্গ সরকাররের পশ্চিমবঙ্গ সাঁওতালি আকাদেমী থেকে কবি সারদা প্রসাদ কিস্কু স্মৃতি পুরষ্কার প্রদান করা হয়।
কবি সারদা প্রসাদ কিস্কু পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উড়িষ্যার বাসিন্দাদের কাছে অবিস্মরণীয়। সেই সাথে বিশ্বায়নের এই যুগে তিনি এশিয়ার সমস্ত শোষিত আদিবাসী জনজাতির জন্য এক অনুপ্রেরণা। ভারতীয় উপমহাদেশে গণতন্ত্র অগ্রযাত্রার একজন পথিকৃৎ হিসেবেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি ষাটের দশকে নিজেকে শুধমাত্র একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি। কৌম সমাজ সংস্কারেও তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন। জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়াতে আদিবাসীদেরকে সমাজের কু-সংস্কারের বিষয়ে সচেতন করেছিলেন। মেয়েদেরকে ডাইনীঅপবাদে আখ্যা দিয়ে সমাজচ্যূত ও হত্যানিরোধের বিরুদ্ধে তিনি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি অসাধারন নৈপূণ্যে তৎকালীন আদিবাসী কৌম সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে সচেতনতা মূলক প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, কবিতা ও গান লিখেছেন। আদিবাসী সমাজের অন্ধকার দিক নিয়েও তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর লেখনী কুসংস্কারে আচ্ছন্ন আদিবাসী সমাজের ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অদম্য লেখনীর মাধ্যমে আদিবাসী সামাজিক প্রথা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, চিন্তা-ধ্যান, এবং ধর্মীয় মতবাদ তিনি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। অজ পাড়া গাঁয়ের দরিদ্র-অবহেলিত সাঁওতাল পল্লীতে তাঁর কবি প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সম-সাময়িক বাঙ্গালী সাহিত্যিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে লেখা শুরু করেন। কলমের মাধ্যমে আদিবাসী জীবন-জীবিকা সাহসের সাথে তুলে ধরার জন্য তৎকালীন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ও সংগঠকে তিনি রুপান্তরিত হয়েছিলেন।
সারা বিশ্বে ৩৭ কোটি আদিবাসীর দুই-তৃতীয়াশের বসবাস এশিয়া মহাদেশে। এশিয়ার প্রায় প্রত্যেকটি দেশে আদিবাসী জনজাতির মানুষ বসবাস করেন। উপমহাদেশে আদিবাসীরা পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। স্বকীয় সরলতা, সামাজিক রীতিনীতি, কৃষ্টি-কালচার, সংস্কৃতির, দর্শণ ও মতবাদের জন্যে সমাজের মূল জনস্রোতের কাছে তারা অবহেলিত। ইউরোপীয়ানদের পাশাপাশি আর্য সভ্যতার অনেক খ্যতিমান সাহিত্যিকেরাই আদিবাসী সভ্যতাকে জংলী সভ্যতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অনেক বুদ্ধিজীবি পর্যন্ত মনে ভূল ধারণা পোষণ করেন - আদিবাসীদের সাহিত্য-কৃষ্টি আদিম এবং অসভ্য।
আদিবাসীরা পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদ এবং স্বাধীনোত্তর মূল জনস্রোতের সাথে প্রতিযোগিতায় না পেরে বর্তমানে প্রান্তিকতার শীর্ষে রয়েছে। অনেক আগেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী আদিবাসীদের সংস্কৃতির শেকড় হতে বিচ্ছিন্ন করেছিল। শোষণ-নীতির বেড়াজালে পুরার জন্যে পশ্চিমারা আদিবাসীদের দর্শণ টাকেই পাল্টে দিয়েছিল। আদিবাসীদের কৌশলে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল - আদিবাসী সমাজের দর্শণ-চিন্তা, সামাজিক রীতি-নীতি ও কৃষ্টি অবৈজ্ঞানিক। হিন্দুদের ধর্মীয় সংঘ ও খ্রিষ্টান মিশনারীর দল আদিবাসীদের দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ রাখার জন্যে ব্যপকভাবে ধর্ম প্রচারের কাজ শুরু করেন। তোষণ বা শোষণের এই বেড়াজাল সম্পর্কে আদিবাসীরা সচেতন হয়েছিলন। বীর বীরসা মুন্ডার উলগুলানবা বিদ্রোহের ডাক সেটারই প্রতিফলন।
আঠার-উনিশ শতকের মাঝামাঝি পশ্চিমা মিশনারীরা দলে দলে আদিবাসী অধ্যূষিত এলাকাতে যেতেন আদিবাসীদের খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য। এবং মিশনারীরা সফল হয়েছেন। চরম দরিদ্রের কবলে একটু সুখের টানে মানুষ ঠিকই প্রলোভনে পা দিয়েছিল। আঠার শতকের শেষে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সচেতনতার ফলে আদিবাসীরা আবার শেকড়ের টানে নিজ সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে শুরু করেন। শেকড়ের টানে নিজ সংস্কৃতিতে ফেরার অনুভবতা আদিবাসীদের মধ্যে এমনিতে জাগ্রত হয়নি। কবি সাহিত্যিকদের চেতনামূলক অসংখ্য গান, কবিতা, প্রবন্ধ, ও সাহিত্যের  অনুপ্রেরণায় শেকড়ে ফেরার চেতনা জাগিয়েছিল আদিবাসীদের।
কালজয়ী সেসব কবি প্রতিভার মধ্যে ছিলেন- সাধু রামচাঁদ মুরমু এবং পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু। তাঁরা ছিলেন সারদা প্রসাদ কিস্কুর সমসাময়িক বিখ্যাত কবি। সারদা প্রসাদ কিস্কু ছিলেন সাধু রামচাঁদ মুরমুর অনুসারী ও ভক্ত। কবি সারদা প্রসাদ কিস্কু রচিত বঙ্গা-সোড়েকবিতাটি তৎকালীন পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট আদিবাসী সাঁওতালদের নিজ সংস্কৃতিতে ফেরার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
ঋণ স্বীকার – সারসাগুন পত্রিকা ও মারিও সুইটেন মুরমু।

আদিবাসী সাঁওতাল সমাজের কিংবদন্তী সমাজ নেতা ও অলচিকি লিপির উদ্ভাবক পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু।

ভারতবর্ষের ওড়িশা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ জেলার ডাহারডি (ডান্ডবস) গ্রামে ১৯০৫ সালের ৫ই মে বৈশাখী পূর্ণমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে পণ্ডিত রঘুনাথ মুরমু জন্মগ্রহণ করেন। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। বাবা নন্দলাল (সিদ নামেও ডাকা হত) এবং মা সলমা (সুমি নামেও ডাকা হত)। নন্দলাল মুরমুর দুই মেয়ে - বাহা ও সনা। রঘুনাথ হলেন তৃতীয় সন্তান। চতুর্থ পুত্রের নাম দুবরাজ। সাঁওতাল সমাজের রীতি মেনেই নন্দলাল তাঁর তৃতীয় সন্তানের নামকরণ তার ঠাকুরদার নামেই রাখেন চুনু। ছোটো বেলায় চুনুর অসুখ বিসুখ লেগেই থাকত। নাজেহাল পিতা একদিন এক ওঝা ডেকে এনে ঝাড়ফুঁক করান। সেই ওঝার পরামর্শ অনুযায়ী চুনুনামের পরিবর্তন ঘটিয়ে রাখা হয় রঘু বা রঘুনাথ। জানা যায়, ‘রঘুকোন এক ওঝার নাম।
বালক রঘুনাথের বয়স যখন সাত বছর তখন তাকে পাশের গ্রাম গাম্ভারিয়া ইউ. পি. স্কুলে ভর্তি করা হয়। শিশু রঘুনাথ ওড়িয়া ভাষা বুঝতে পারতেন না তবু তাঁকে ওড়িয়া ভাষাতেই পড়াশোনা আরাম্ভ করতে হয়। গাম্ভারিয়া স্কুলের পর বহড়দা M.E. স্কুলে তাঁকে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। মেধাবী রঘুনাথ ১৯২২ সালে M.E. পাশ করেন এবং বারিপাদা হাইস্কুল অফ্ ময়ূরভঞ্জ (বর্তমানে এম. কে. সি. হাইস্কুল)-এ ভর্তি হন। এখান থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করেন ১৯২৪ সালে (মতান্তরে ১৯২৮ সালে)। ১৯৩১-৩২ সালে বারিপাদা পাওয়ার হাউস থেকে Apprenticeship করেন। তারপর, ময়ূরভঞ্জের দেওয়ান ডঃ পি. কে. সেন-এর উদ্দ্যোগে রঘুনাথ কোলকাতা, শ্রীরামপুর, গোসাবা থেকে Industrial Training লাভ করেন। পড়াশোনায় তাঁকে ইতি টানতে হয় কেন না দারিদ্র্যতার জন্য তিনি আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেন নি।
রঘুনাথ মুরমুর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৩০-৩১ সালে লোকগণনার অস্থায়ী কর্মী হিসাবে। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর বারিপাদার পূর্ণ-চন্দ্র ইণ্ডাসট্রিয়াল ইনস্টিটিউটে Instructor হিসাবে কাজ করেন। ১৯৩৩ সালে রঘুনাথ মুরমু বড়মতাড়িয়া মডেল ইউ. পি. স্কুলে ইনডাসট্রিয়াল শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। কিছুদিন পরেই এখানকার প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে রায়রংপুর হাইস্কুলে Promotion দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়। ১৯৪৬ সালেরই ফেব্রুয়ারি মাসের ছয় তারিখ তিনি স্বেচ্ছায় চাকরী থেকে ইস্তফা দেন। ছোটবেলায় রঘুনাথ যখন স্কুলে পড়তেন তখন উড়িয়া ভাষায় পড়াশোনা করা তাঁর পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়েছিল। মাতৃভাষায় কেন পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না সেকথা তাঁর মনে প্রশ্ন জাগায়। তিনি জানতে পারেন, নিজের মাতৃভাষায় লিপি নেই বলে মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তারপর থেকেই সাঁওতালি ভাষার জন্য লিপি উদ্ভাবনের কথা তাঁর মাথায় আসে। আসলে, সাধুরাম চাঁদ মুরমুর মতোই রঘুনাথ মুরমুও বুঝেছিলেন যে, সাহিত্যের বিকাশ ব্যতীত জাতির বিকাশ অসম্ভব এবং সাহিত্যের বিকাশে নিজস্ব লিপি একান্তভাবেই প্রয়োজন। তাই মামা সাওনা মুরমুর সঙ্গে বহু আলোচনার পর, অসম্ভব পরিশ্রম করে সাঁওতালি ভাষার ১৯২৫ সালে সাঁওতালি লিপির সৃষ্টি করেন। নাম দেন-অলচিকি
১৯৩৮ সালে অলচিকি প্রসারের জন্য কাঠের ছাপা মেশিন তৈরি করেন। ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বারিপাদার এক সভায় রঘুনাথ ছাপা মেশিন ও অলচিকি-কে জনসমক্ষে আনেন। মহারাজ তা দেখেন এবং খুশি হন। তারপরই প্রকৃতপক্ষে অলচিকিপ্রচারের কাজ শুরু হয়। জামশেদপুরের খেরওয়াল জারপা সমিতির সহযোগিতা লাভ করেন। তারপর কোলকাতার স্বদেশি টাইপ ফাউন্ড্রিতে গিয়ে রঘুনাথ অলচিকি’-র টাইপ তৈরি করান। মুনিরাম বাসকের উদ্যোগে চাঁদান প্রেস’-এর স্থাপন হয়। অলচিকি লিপিতে মুদ্রণের কাজ ত্বরান্বিত হয়। অলচিকি প্রচারের জন্য পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু ১৯৬০ সালে আদিবাসী সোশিও এডুকেশনাল এন্ড কালচারাল এসোশয়েশন’ (Adibasi Socio Educational & Cultural Association বা ASECA) বা আদিবাসী সমাজ-শিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করেন। ওড়িশা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এই সংগঠন ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি গড়ে উঠে All India (Adibasi) Santal Council অলচিকি প্রচারের আন্দোলন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
সাঁওতাল জাতির যথার্থ শিক্ষা বিস্তারে অলচিকি লিপির উদ্ভাবনেই থেমে থাকেননি পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু। শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্, তাদের সম্পর্কে দরদি মন নিয়ে এবং বিশেষ শিক্ষাভাবনা ও কল্পনার মিলনে লিখেছেন সচিত্র শিশু পাঠ্য বই অল চেমেদ। স্বদেশি ফিউন্ড্রির নিজস্ব কাঠের হরফে প্রথমে ছাপার কাজ শুরু। কাঠের ব্লক তৈরি করেছেন নিজে। ব্লকে নিজেই খোদাই করেছেন পরিচিত জীবজন্তু বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের শিল্পরূপ। ইত্যাদি বিষয় আশ্চর্য সুন্দর শিল্পময়তায় কাঠের ব্লকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। (পরবর্তিকালে যথারীতি ধাতু নির্মিত ব্লক ব্যবহৃত)। অল উপরুমবইটিও শিশুপাঠ্য। একগুচ্ছ চিরন্তন সত্যকথা বা প্রাকৃতিক নিয়ম লিখেছেন শিশু মনস্তত্ত্বের উপযোগী করেই। পারশি পহা’- য় অলচিকি লিপির প্রাথমিক রূপ এবং পারশি অপাত্বইয়ে অলচিকি লিপির অঙ্কুরোদগম। জাতির উন্নতিতে স্বাস্থ্যই সম্পদ-এই সমাজহিতকর ভাবনা তাঁর দাড়েগে ধননাটকে সুন্দরভাবে চিত্রিত । অলচিকি লিপিতে লেখা ধারাপাত, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ, ইত্যাদি শিশুপাঠ্য গণিত শিক্ষা এলখাবইয়ে বিধৃত। পারশি ইতুনতাঁর লেখা ইংরেজি শিক্ষার বই। বারিপাদার কালকাপুরে, ১৯৭৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি অবধি তিনি নিজে এই বই থেকে ছাত্রদের শিক্ষা দেন। সাঁওতালি শিক্ষার জন্য সহজ ব্যাকারণ বই রণড়লিখেছেন। বইটিতে তিনি বলেছেন-সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি ভাষার মিলের কিছু কথা। সামাজিক জীবনে সাঁওতালদের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ বিষয়ক নীতি বিধানের কথা লিখেছেন বাঁখেড়বইয়ে । সমগ্র সাঁওতাল জাতির আত্মজিজ্ঞাসা ও প্রেরণামূলক অগ্রগতির ভাবনা রাঃ আদড়বইয়ে চিত্রিত করেছেন । তাঁর উপদেশ মূলক গানের বই লাকচার। তাঁর হিতালগ্রন্থ তিনখণ্ডে মহাকাব্যধর্মী । পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিভার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তার পরিপেক্ষিতে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন ।
পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু কেবলমাত্র অলচিকিলিপির স্রষ্টাই ছিলেন তা নয়, পাশাপাশি কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার (যাত্রাপালা রচয়িতা) এবং বিদগ্ধ দার্শনিকও ছিলেন । তাঁর আদর্শে সাঁওতাল জনমানসে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। স্বাধীনোত্তর ভারতে যখন ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন শুরু হয় তখন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু-রই আদর্শে দীক্ষিত সুনারাম সরেনের নেতৃত্বে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হন। ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের দাবি তাঁরাও করেন অর্থাৎ সাঁওতালি ভাষার ভিত্তিতে সাঁওতালদের জন্য পৃথক রাজ্য । কিন্তু অদৃষ্টের চরম পরিহাস, স্বাধীন ভারতের সরকার ময়ূরভঞ্জের গুডুরিয়ায় ১৯৪৮ সালে নিরস্ত্র সাঁওতালদের জমায়েতে নির্বাচারে গুলি চালায়। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পন্ডিত রঘুনাথ মুরমুই যে সাঁওতালদের তাত্ত্বিক নেতা, তা সরকার বুঝতে পেরে তাঁকে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করে। তিনি আত্মগোপন করেন ফলে তাঁকে গ্রেফতার করা যায়নি। এ হেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব ১৯৮২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তাঁর কর্মযজ্ঞ অসমাপ্ত রেখে পরলোকগমন করেন।
সৌজন্য - Aven Taras (facebook)

মহারাষ্ট্রে দশ বছরে ৫০০ আদিবাসী আশ্রম-বালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ।


মহারাষ্ট্রের আবাসিক আশ্রম স্কুলগুলির ৫০০ বালিকার রহস্য-মৃত্য‌ু নিয়ে নড়েচড়ে বসল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭ তারা এ ব্য‌াপারে রাজ্যের মুখ্য‌ সচিবের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে। ছসপ্তাহের মধ্য‌ে সেই রিপোর্ট দিল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে, এই ঘটনাগুলি জানার পর রাজ্য‌ প্রশাসন কী ব্য‌বস্থা নিয়েছে। আদৌ এ ব্য‌াপারে প্রশাসন কতটা ওয়াকিবহাল সে সম্পর্কেও কমিশনের চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের এই আশ্রম স্কুলগুলিতে আদিবাসী মেয়েরা পড়াশোনা করে। গত ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭ একটি মারাঠি সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী কমিশন জানতে পেরেছে স্কুলগুলিতে নাকি নির্বিচারে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়। এ ব্যাপারে কেউ মুখ খুললে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমিক দেওয়া হয়। গত দশ বছরে হয় প্রতিবাদ করায় আর নয়তো বাড়ির লোক জেনে ফেলায় ৫০০ আদিবাসী মেয়েকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। কখনও বলা হয়েছে শরীর খারাপ থাকার কারণে মৃত্য‌ু হয়েছে। কখনও বা নিছক দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা হয়েছে। ঘটনাগুলি যে ভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে তাতে বেশ বোঝা যায় এর সঙ্গে একটি বা একাধিক চক্র জড়িয়ে আছে। তারা মেয়ে পাচারের কাজেও সিদ্ধহস্ত। কারণ বহু আশ্রমিক স্কুলের মেয়েদের পরবর্তীকালে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও রিপোর্ট এসেছে। এরা পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ রেখে কাজ করত। উল্লেখ্য‌, নয়ের দশকে মহারাষ্ট্রের জলগাঁওতে ঠিক এ ভাবেই একটি বীভৎস যৌনচক্রের খোঁজ পাওয়া যায়। সেখানে অসহায় মেয়েদের হয় ব্ল্যাকমেল করে, নয়তো প্রাণের ভয় দেখিয়ে যৌনচক্রে অংশগ্রহণ করা এবং পর্নোগ্রাফিতে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য‌ করা হত। সেখানেও প্রশাসনের একাংশের এর সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
এ ব্য‌াপারে সংবাদপত্রে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০১৬-র অক্টোবরে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল গত দশ বছরে আদিবাসী আশ্রম স্কুলগুলিতে গত দশ বছরে ৭৪০ জন ছাত্রছাত্রী মারা গিয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ঠিক তার পর ২৬ নভেম্বর সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট উদ্ধৃত করে সরকারের জবাবদিহি চায়। কিন্তু বিজেপি-শিবসেনা সরকার জবাব দেওয়ার দরকার আছে বলে মনে করেনি।
গত ১৪ জানুয়ারি ফের সংবাদপত্রে যে রিপোর্ট বের হয় তাতে বলা হয়েছে, এই ধরনের স্কুলগুলিতে মেয়েদের নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা করা হত। শুধু তা-ই নয়, তাদের ঋতুমতী হওয়ার যাবতীয় তথ্য‌ সংরক্ষণ করা হত। কিন্তু এ ধরনের পরীক্ষা বা সংরক্ষণের কী প্রয়োজন তার কোনও সঠিক ব্য‌াখ্য‌া স্কুল কর্তৃপক্ষ দেয়নি। আসলে যৌন নির্যাতনের পর কোনও মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ছে কিনা তা দেখতেই এই ব্য‌বস্থা বলে জানা গিয়েছে। সম্প্রতি দেওয়ালির ছুটি কাটিয়ে একটি ছাত্রী স্কুলে ফেরার পর তাঁর পেটে ব্য‌থা হচ্ছে বলে রিপোর্ট করে। জানা যায়, স্কুলে যৌন হেনস্থার শিকার হয়ে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। মহারাষ্ট্রের ধুলধানা জেলার খামগাও তালুকের ১২ বছরের একটি মেয়ে অভিযোগ করে স্কুলের জমাদার নাকি তাঁকে যৌন হেনস্থা করেছে। ওই আবাসিক স্কুলটিতে সত্তর জন ছাত্রী আছে কিন্তু তার কোনও মহিলা সুপার নেই।
মহারাষ্ট্রে এই মুহূর্তে ১১০০টি এই ধরনের সরকার পরিচালিত আশ্রম-স্কুল রয়েছে। সেখানে দেড় লক্ষেরও বেশি মেয়ে এবং প্রায় আড়াই লক্ষ আদিবাসী ছেলে পড়াশোনা করে। সংবাদপত্রের রিপোর্টে প্রকাশ এই স্কুলগুলিতে গত ১৫ বছরে ১৫০০ ছাত্রছাত্রীর মৃত্য‌ু হয়েছ যার মধ্য‌ে প্রায় ৭৫০ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ছাত্রী। এই মৃত্য‌ুর পিছনে যৌন নির্যাতন অন্য‌তম প্রধান কারণ বলে মনে করে মহারাষ্ট্রে এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি।
সৌজন্য – খবর অনলাইন, ০৮০২/২০১৭, শৈবাল বিশ্বাস।  

ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর পতনের ইতিহাস।




একসময়ে পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, ও বাঁকুড়া জেলা জুড়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছিল ঝাড়খণ্ড পার্টি। কিন্তু ১৯৯৬-৯৭ সাল নাগাদ কেন্দ্রীয় সভাপতি এন ই হোরোর  সঙ্গে নরেন হাঁসদার মতবিরোধের জেরে ঝাড়খণ্ড পার্টি বিভাজিত হয়ে গঠিত হয় ঝাড়খণ্ড পার্টি (হোরো) ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)। নরেন হাঁসদা নিজে পশ্চিমবঙ্গের ভুমিপুত্র হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ নেতা কর্মীরা ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এ যোগদান করেছিলেন। নরেন হাঁসদার নেতৃত্বে পশ্চিমবাংলার জঙ্গলমহল জুড়ে সবথেকে শক্তিশালী ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক দল হিসেবে উত্থান ঘটে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর। ১৯৯১ সালের পর পশ্চিমবাংলার বিধানসভায় একমাত্র ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিধায়ক পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)। নরেন হাঁসদা নিজে দুই দফায় বিনপুর বিধানসভা থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০০০ সালে নরেন হাঁসদার অকাস্মত মারা যাবার পর নরেন হাঁসদা স্ত্রী ও বর্তমানে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর সভানেত্রী শ্রীমতী চুনিবালা হাঁসদাও দুই দফায় বিনপুর বিধানসভা থেকেই বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুসময় আর নেই। ভুল রাজনৈতিক নেতৃত্বের জেরে বর্তমানে সংগঠন বিহীন হয়ে পড়েছে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন)।
২০০০ সালে নরেন হাঁসদা মারা যাবার পর ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) আবার বিভাজিত হয়। প্রয়াত নরেন হাঁসদা কয়েকজন অনুগামী গৃহবধূ চুনিবালা হাঁসদাকে সভানেত্রী হিসেবে তুলে ধরে। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর দীর্ঘদিনের নেতা, কর্মীদের বাদ দিয়ে গৃহবধূ চুনিবালা হাঁসদাকে সভানেত্রী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে আরেক অংশ নরেন হাঁসদার দীর্ঘদিনের সহযোগী ও
বিভিন্ন আন্দোলনের পোড়খাওয়া নেতা আদিত্য কিস্কুকে সভাপতি হিসেবে তুলে ধরে। গঠিত হয় ঝাড়খণ্ড পার্টি (আদিত্য)। এর পরেও আবার ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) বিভাজিত হয়। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর জনপ্রিয়তম যুব নেতা বাবু বোস (রবীন্দ্রনাথ বসু) দীর্ঘদিনের জেল বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে ঝাড়খণ্ড পার্টি (বাবু বোস) গঠন করে।
চুনিবালা হাঁসদা নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন), আদিত্য কিস্কু নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড পার্টি (আদিত্য) ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (বাবু বোস), তিনটি গোষ্ঠী স্বীকৃতি পাবার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানান। নির্বাচন কমিশন চুনিবালা হাঁসদার নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) গোষ্ঠীকে প্রকৃত ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর পর আদিত্য কিস্কু নিজের গোষ্ঠীকে ঝাড়খণ্ড অনুশীলন পার্টি হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত করেন। বাবু বোস তার গোষ্ঠীকে ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চা হিসেবে নির্বাচন কমিশনে স্বীকৃতি করান।
বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভাজিত হয়ে যাওয়ায় ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর জনসমর্থনে বিপুল ধস নামে। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর কোন গোষ্ঠীই পরবর্তীকালে নির্বাচনী সাফল্য পায়নি।
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে চুনিবালা হাঁসদার দীর্ঘদিনের অনুগামী ও জামবনি এলাকার যুব নেতা অর্জুন হাঁসদা ওরফে লাল নির্দল প্রার্থী হিসেবে বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রেই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ঘোষণা করে। অর্জুন হাঁসদা ভোট কেটে নেওয়ায় পরাজয় ঘটে চুনিবালা হাঁসদার। কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) মনোনীত প্রার্থী চুনিবালা হাঁসদাকে মাত্র ৭ হাজার ৬১০ টি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হন সিপিএমের দিবাকর হাঁসদা। দিবাকরবাবু পান ৬০,৭২৮টি ভোট (৪১.১৭%)। চুনিবালা পেয়েছিলেন ৫৩,১১৮টি ভোট (৩৬%)। গোঁজ প্রার্থী অর্জুন হাঁসদা ১৪,৪৫৯টি ভোট (৯.৮০%) কেটে নেওয়ায় হেরে যান চুনিবালা।
২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) কোন পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদ আসন জিততে পারেনি।
২০১৪-র লোকসভা ভোটে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) প্রার্থী চুনিবালা হাঁসদা পেয়েছিলেন মাত্র ৭৬০৮ টি ভোট, অথচ ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা প্রার্থী বুদ্ধদেব মান্ডি পেয়েছিলেন ১৫১১৪ টি ভোট। ঝাড়খণ্ড দিশম পার্টির প্রার্থী মিলন মান্ডি পেয়েছিলেন ৬০১৩ টি ভোট, ঝাড়খণ্ড অনুশীলন পার্টির প্রার্থী মুরারি মোহন বাস্কে পেয়েছিলেন ৩৮৭৭ টি ভোট।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) চরম ব্যর্থ হয়। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) এর দীর্ঘদিনের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রয়াত নরেন হাঁসদার কন্যা ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) মনোনীত প্রার্থী বিরবাহা হাঁসদার জমানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়। মাত্র ৭০৯৪ টি ভোট (৪.০৮%) পান নরেন হাঁসদার মেয়ে বিরবাহা হাঁসদা। ঝাড়গ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম সমর্থিত চুনিবালা হাঁসদা অবশ্য ৪৪০০৫ টি ভোট (২৪.৩৭%) পান যদিও বলাই বাহুল্য সেগুলি সিপিএমের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক।
চুনিবালা হাঁসদার বিরুদ্ধে অধিকাংশ ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ যে ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক ঐক্য গঠনে চুনিবালা হাঁসদা চরম উদাসীন। বার দুয়েক ঝাড়খণ্ডী রাজনৈতিক দল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (JMM), ঝাড়খণ্ড অনুশীলন পার্টি (JAP), ঝাড়খণ্ড দিশম পার্টি (JDP), ঝাড়খণ্ড পিপলস পার্টি (JPP) কে নিয়ে ঝাড়খণ্ডী ঐক্য গঠন করলেও, চুনিবালা হাঁসদার নেতৃত্বে ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) দূরে থেকেছে। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) ও ঝাড়খণ্ড অনুশীলন পার্টিকে এক করার চেষ্টা হলেও, অভিযোগ যে চুনিবালা হাঁসদার অনড় মনোভাবের জন্য প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি।